প্রতি বছর ৮ মার্চ সারা বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সমাজে নারীদের অর্জন, তাদের সংগ্রামের ইতিহাস এবং আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য দিনটি উৎসর্গ করা হয়েছে। ২০শ শতকের শুরুতে নারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সূচনা হয়।ভালো কাজের পরিবেশ, কাজের সময় কমানো, সমান মজুরি এবং ভোটাধিকার দাবি জানিয়ে হাজার হাজার নারী শ্রমিক ১৯০৮ সালে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে মিছিল করেছিলেন।
১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন নারীদের অধিকার সমর্থনে একটি বিশেষ দিন পালনের প্রস্তাব দেন।এরপর ১৯১১ সালে প্রথমবার জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক এবং সুইজারল্যান্ডে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চ কে “আন্তর্জাতিক নারী দিবস” হিসেবে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃতি দেয়। এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় “অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক”
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কথা বলেছেন রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সপ্তর্ষি চাকমা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক সঞ্চিতা চক্রবর্তী।
সঞ্চিতা চক্রবর্তী : আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং শিক্ষাজীবনের সেই দিনগুলোর গল্প দিয়ে যদি শুরু করি— যা আজকের আপনাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
সপ্তর্ষি চাকমা: আমার জন্ম ১৯৮৭ সালে রাঙ্গামাটি জেলার মগবান ইউনিয়নের মোরঘোনা গ্রামে। কাপ্তাই লেক ও প্রকৃতির কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই গ্রামেই আমার শৈশব কেটেছে। আমরা ছিলাম নয় ভাই-বোনের একটি বড় সংসার—আট বোন ও এক ভাই। বাবা ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, আর মা সংসারের নানা কাজে সময় দিতে পারতেন না আমাদের পড়াশোনায় তেমনভাবে। কিন্তু এর মধ্যেই আমাদের বড় দিদি, বীণা প্রভা চাকমা, তিনিই ছিলেন আমার প্রথম শিক্ষাগুরু। তাঁর কাছেই আমার হাতেখড়ি হয়—অ, আ, ক, খ শেখা থেকে শুরু করে ছড়া-কবিতা আয়ত্ত করা। আমার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় গোলাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গ্রামের মাটি, পথঘাট, স্কুলের সেই পুরোনো বেঞ্চ—সবকিছুই মনে পড়ে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ছোট ছোট বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো ছিল একেবারে অন্যরকম। প্রাথমিক শেষ করে ভর্তি হলাম রাঙ্গামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেটি ছিল শহরের প্রথম দিকের একটি স্বনামধন্য এবং তিন পার্বত্য জেলার প্রথম সরকারি বালিকা বিদ্যালয়। সেখানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি—প্রতিটি ক্লাস ও শিক্ষকদের সান্নিধ্য আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। কঠোর পরিশ্রম আর শিক্ষকদের সহযোগিতায় ২০০২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হই। এরপর পড়াশোনার গন্তব্য হয় রাঙ্গামাটি সরকারি মহিলা কলেজ।কলেজ জীবন আমার জন্য ছিল নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া, পছন্দের বিষয় বেছে নেওয়া, স্বপ্ন দেখার পাল্লা ভারি হওয়া—এসব কিছুই ঘটতে থাকে ওই সময়ে। কলেজের ক্লাস, বন্ধুদের আড্ডা, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা—সব মিলিয়ে এক প্রফুল্লময় জীবন। ২০০৪ সালে আমি এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হই।
এইচএসসির পর উচ্চশিক্ষার জন্য আমার পছন্দ ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানকার ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ভর্তি হই।নতুন শহর, নতুন পরিবেশ সাথে নতুন এক অধ্যায়ের শুরু। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ক্যাম্পাস, পাহাড়ের নিদারুণ সৌন্দর্য্য, সবুজের সমারোহ সব মিলিয়ে এক ভিন্ন জগৎ। সেখানে আমি বিবিএ ও পরবর্তীতে এমবিএ সম্পন্ন করি। এই সময়টাই আমাকে একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি জীবনকে গভীরভাবে বুঝতে শিখিয়েছে।
পড়াশোনা শেষ করে আমি ফিরে আসি নিজের জেলা রাঙ্গামাটিতে। এবং যোগদান করি রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে আমি শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। এ যেন আমার ছোটবেলার গ্রাম থেকে উঠে আসা এক মেয়ের জীবনের পূর্ণতা যেখানে শুরুটা ছিল বড় দিদির হাতে খড়ি দিয়ে আর আজ পৌঁছে গেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার জগতে।
সঞ্চিতা চক্রবর্তী: শৈশব মানেই একরাশ স্মৃতি। একজন নারী হিসেবে ফেলে আসা দিনগুলোর এমন কোনো বিশেষ মুহূর্ত কি আছে, যা আজও আপনাকে শত কর্মব্যস্ততার মাঝেও আন্দোলিত করে তোলে সে বিষয়ে যদি বলতেন?
সপ্তর্ষি চাকমা: শৈশব মানেই একরাশ স্মৃতি। প্রতিটি মানুষের জীবনে শৈশব এমন এক ক্যানভাস, যেখানে রঙগুলো মিশে থাকে নির্ভেজাল আনন্দ, মায়া আর আবেগে। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যখন শৈশবের কথা মনে করে, তখন অন্ততপক্ষে মিনিট খানেকের জন্য হলেও হারিয়ে যায় বর্তমান থেকে। আমর ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই । বয়স এখন আর শৈশবের কাছাকাছি নেই, দায়িত্বের বোঝাও কম নয়। তারপরও যখন পুরোনো দিনগুলোর জানালা খুলে বসি, তখন মন ভেসে যায় গ্রামের সবুজ শ্যামল পরিবেশে ও কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ জলে। শৈশবের অসংখ্য ঘটনা ভিড় করে আসে মনে। তবে যে ঘটনাটি আজও আমাকে নাড়া দিয়ে যায়, শত কর্মব্যস্ততার মাঝেও আন্দোলিত করে তোলে, সেটি হলো নৌকা বেয়ে স্কুলে যাওয়ার সেই দুঃসাহসী ও রোমাঞ্চকর দিনগুলি
রাঙ্গামাটির মোরঘোনা গ্রাম। আমাদের স্কুল ছিল গোলাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। চারপাশে পাহাড়, মাঝে কাপ্তাই লেক, সেখানে সড়কপথে যাতায়াত ছিল প্রায় অকল্পনীয়। গ্রামের ছেলেমেয়েরা আমরা সবাই তাই নৌকা বেয়েই স্কুলে যেতাম। ভোরবেলা মা যখন ঘুম থেকে তুলে দিতেন, চোখ কচলাতে কচলাতেই মনে পড়ে যেত— আজ নদীর স্রোত কেমন হবে? ভাটা না ভরা?
সেই ছোট্ট নৌকাটি ছিল আমাদের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। কখনো আমরা পাঁচ-ছয়জন, কখনো তারও বেশি— সবাই মিলে উঠে পড়তাম সেই কাঠের তরীতে।
কত ঝড়-বৃষ্টি যে পেয়েছি সেই নৌকায় চড়ে! বিশেষ করে বর্ষাকালে নদী ফুলে-ফেঁপে উঠত। বৃষ্টি নামলে আমরা মাথায় পলিথিন দিয়ে নৌকায় উঠতাম। এক হাতে বইয়ের ব্যাগ বুকে চেপে ধরা, আরেক হাতে নৌকার কিনারা। ঢেউয়ের তালে তালে নৌকা যখন দোল খেত, শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে যেত।
ছোটবেলায় সেই দোলা আমার কাছে মজার ছিল। কিন্তু ভয়ও কম লাগত না। বিশেষ করে যখন লেকের মাঝখানে গিয়ে হঠাৎ বাতাসের গতি বেড়ে যেত, তখন নৌকার গতি অন্য রকম হয়ে যেত। মনে হতো, যেন লেক আমাদের গিলে খেতে চাইছে। আজ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস নিই, শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায় সেই ছোট্ট নৌকার কথা। মনে পড়ে যায়— এক হাতে ব্যাগ, আরেক হাতে নৌকার কাঠ, এমন করেই তো আমরা বড় হয়েছি। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে, প্রকৃতির কাছেই বেঁচে থাকতে শিখেছি। সেই নৌকা আমাকে শুধু স্কুলে পৌঁছে দেয়নি, শিখিয়েছে জীবনের শত প্রতিকূলতা মেনে নেওয়া। শিখিয়েছে ভয় আর আনন্দ একসঙ্গেই বাঁচতে হয়। একজন নারী হিসেবে আজ যখন আমি স্বাবলম্বী, পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত— পেছনে ফিরে তাকাই, তখন দেখি সেই নৌকা ভ্রমণের দিনগুলোই আমাকে গড়েছে। ভয়কে জয় করা, প্রতিকূলতার মাঝেও সামনে এগিয়ে যাওয়া— সব কিছুর শুরু সেই নৌকায় বসেই।
সঞ্চিতা চক্রবর্তী : একজন নারীর সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর পেছনে কোন বিষয়গুলো প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে বলে আপনি মনে করেন? এক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থন একজন নারীকে কতটা আত্মবিশ্বাসী করে তোলে?
সপ্তর্ষি চাকমা: একজন নারীর সাফল্যের পেছনে নানাবিধ উপাদান কাজ করে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রধান শক্তি হলো—
প্রথমত, নিজের ওপর আস্থা ও দৃঢ়তা। সাফল্যের প্রথম শর্তই হলো নিজের প্রতি বিশ্বাস। যে নারী নিজের সামর্থ্যে আস্থা রাখতে পারেন, তিনি যেকোনো প্রতিকূলতাকে জয় করতে সক্ষম।
দ্বিতীয়ত, মানসিক দৃঢ়তা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। জীবনে উত্থান-পতন লেগেই থাকে। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।
তৃতীয়ত, শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন। জ্ঞানই শক্তি। সময়োপযোগী শিক্ষা ও দক্ষতা নিজের পথ নিজেই তৈরি করে দেয়।
চতুর্থত, পরিবারের সহযোগিতা ও মানসিক সমর্থন। এটি সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের সমাজব্যবস্থায় পরিবারের সহযোগিতার ভূমিকা একেবারেই অনস্বীকার্য। বিশেষ করে একজন নারীর জীবনে পরিবারের সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ , তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
যখন একটি মেয়ে তার স্বপ্নের কথা বলে, তখন পরিবারের প্রথম প্রতিক্রিয়াটিই হয় তার ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম ইট। পরিবার যদি তাকে উৎসাহ দেয়, তবে সে নিজের ওপর আস্থা রাখতে শেখে। পরিবারের বিশ্বাসই তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। আর আত্মবিশ্বাসী নারীই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে।
আমার নিজের জীবনেই দেখি—বাবা মার পাশাপাশি বড় দিদিরা ও দাদা না হলে হয়তো শিক্ষার আলো দেখাই হতো না। গ্রামের মেয়ে হয়ে নৌকা বেয়ে স্কুলে যাওয়ার সময়ও পরিবারের ভরসাটাই তো আমাকে পথ দেখিয়েছে। পরিবারের এই সমর্থন শুধু অর্থনৈতিক বা বস্তুগত নয়; এটি মানসিকও বটে।পরিবারের সদস্যরা যখন বোঝে যে মেয়েটিরও স্বপ্ন আছে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা আছে, তখন সেটাই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
ইংরেজিতে একটি বিখ্যাত উক্তি আছে— “Equity before the law” অর্থাৎ আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। আমি যদি জিজ্ঞেস করি, আমি কি এই কথাটির সাথে পুরোপুরি একমত? উত্তর হবে— হ্যাঁ, অবশ্যই।
আইনের চোখে পুরুষ ও নারী সমান হওয়ার অর্থ হলো, সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য সমান অধিকার, সমান সুযোগ এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা। এটি কোনো দানের বিষয় নয়, এটি মানবাধিকারের মৌলিক শর্ত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— আইনের এই সমতা কি বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয়? অনেক ক্ষেত্রে না। কারণ আইনের বাস্তবায়ন নির্ভর করে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। যতদিন সমাজ নারীকে “অসম” ভাববে, ততদিন আইনের সমতা শুধু কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
তাই আইনের সমতার পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বদল। প্রয়োজন মানবিক মূল্যবোধের চর্চা, যা আমাদের সকলকে প্রকৃত অর্থে সমান করে তোলে।আমি নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান বলে মনে করি, আমার পরিবারে কখনো এই বৈষম্যের স্বীকার হতে হয় নি।
সঞ্চিতা চক্রবর্তী : প্রত্যেক সফল মানুষের পেছনেই অনুপ্রেরণার একটি বড় উৎস থাকে। আপনার আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে বাবা-মা এবং পরিবারের ভূমিকা এবং তাঁদের আদর্শ আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
সপ্তর্ষি চাকমা: প্রত্যেক সফল মানুষের পেছনেই অনুপ্রেরণার একটি বড় উৎস থাকে। কেউ অনুপ্রাণিত হন মা-বাবা থেকে, কেউ বা শিক্ষক থেকে, আবার কেউ নিজের ভাই-বোনের দেখানো পথে হাঁটেন। আমার জীবনেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে। জানি না, আপনাদের মানদণ্ডে আমি কতটুকু সাফল্য অর্জন করেছি। তবে এটি চিরন্তন সত্য যে, আমি আজ এতদূর আসার পেছনে আমার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যারা আমার জীবনের নিয়ামক হিসেবে আমাকে উজ্জীবিত ও আন্দোলিত করেছে, তাঁরা হলেন বাবা,মা ও ভাইবোন।
কিন্তু শুরুতেই বলতে হয় আমার বাবার কথা। তিনি আমাদের শুধু মানুষ করেননি, শিখিয়েছেন জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা— শিক্ষকের প্রতি সম্মান। এই একটি বাক্যই আমাদের শৈশবের ভিত গড়ে দিয়েছিল। শিক্ষক যে শুধু পাঠদানকারী নন, তিনি জীবনের পথপ্রদর্শক— এই বোধ আমাদের মনে গেঁথে দিয়েছিলেন বাবা। বাবা আমাদের দেখিয়েছিলেন জ্ঞানের আলোয় জীবন আলোকিত করার পথ। আর সেই পথেই আমরা হেঁটেছি, হাঁটছি।
সঞ্চিতা চক্রবর্তী : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশা। এই ক্যরিয়ার বেছে নেওয়ার শুরুর দিকের গল্পটা কেমন ছিল? আপনার এই দীর্ঘ পথচলায় কোনো বিশেষ সামাজিক বা পেশাগত বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে কি? সেই প্রতিকূলতা আপনি কীভাবে জয় করেছেন?
সপ্তর্ষি চাকমা: আমরা সবাই জানি, “Life is not a bed of roses” — অর্থাৎ জীবন পুষ্পসজ্জা নয়। এই সত্যটি একজন নারী হিসেবে আমাকে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে হয়েছে।
আজ আমি এই অবস্থানে আসার পেছনে আমাকেও কিছু বড় বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সেসব বাধা পেরোনোর গল্প বলতে গেলে প্রথমেই মনে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার পদে যোগ দেওয়ার সেই দিনগুলোর কথা।
যখন আমি রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবিপ্রবি) শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার জন্য পরীক্ষায় অবতীর্ণ হলাম, তখন আমার বড় ছেলের বয়স ছিল মাত্র ২ বছর। একদিকে মায়ের দায়িত্ব, অন্যদিকে সংসারের নানা কাজ, আবার নিজের ক্যারিয়ার গোছানোর তাগিদ— সবকিছু একসঙ্গে সামলানো ছিল অকল্পনীয় কঠিন। তবে এক্ষেত্রে এখনো আমার স্বামী ও শুশুর বাড়ির সবাই সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।
সঞ্চিতা চক্রবর্তী : কর্মব্যস্ত জীবনের বাইরে নিজের জন্য সময় বের করা নিশ্চয়ই কঠিন। আপনার অবসর কাটে কীভাবে? শিক্ষকতার বাইরে আপনার শখ বা সৃজনশীল কাজের জগৎ সম্পর্কে জানতে চাই।
সপ্তর্ষি চাকমা: কর্মব্যস্ত জীবনের বাইরে নিজের জন্য সময় বের করা নিশ্চয়ই সহজ নয়। বিশেষ করে একজন নারী, যে কিনা একইসাথে মা, স্ত্রী, এতো এতো শিক্ষার্থীর অভিভাবক সাথে সংসারের অনেকগুলো দায়িত্ব একসঙ্গে নিয়ে চলা, তার পক্ষে নিজের জন্য আলাদা করে সময় বের করা অনেকটা বিলাসিতার মতোই। কিন্তু তারপরও আমি বিশ্বাস করি, কর্মব্যস্ততার মাঝে নিজের জন্য কিছুটা সময় না রাখলে জীবন একঘেয়ে হয়ে যায়। মন ও শরীর দুই-ই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আমার ক্ষেত্রে অবশ্য নিজের জন্য সময় বের করার মানে কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কোথাও একা চলে যাওয়া নয়। আমি যখনই সময় পাই, তখন তা কাটাই আমার পরিবারকে নিয়ে। পরিবারই আমার অবসরের সবচেয়ে বড় সঙ্গী।
সঞ্চিতা চক্রবর্তী : আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে নারীর ক্ষমতায়ন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আপনার বিশেষ কোনো বার্তা বা ভাবনা আছে কি?
সপ্তর্ষি চাকমা : আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে প্রতিবছরই নানা আয়োজন, নানা আলোচনা হয়। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকার, নারীর নিরাপত্তা—এসব বিষয় নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো— আসলেই কি আমরা নারী হিসেবে নিজেদের যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারছি? আমরা কি সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগোতে পারছি, যা একজন নারীকে সত্যিকারের ক্ষমতায়নের শিখরে পৌঁছে দেয়? আমার স্পষ্ট বার্তা— হীনমন্যতায় থেকে নয়, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। সমাজ নারীকে যুগ যুগ ধরে কিছু সীমিত পরিধির মধ্যে আটকে রাখতে চেয়েছে। বলা হয়েছে, নারী হবে সংসারমুখী, নারী হবে নির্ভরশীল, নারী হবে পুরুষের ছায়া। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। আজকের নারী নিজেই নিজের আলো। তাই প্রথম কাজ নিজের ওপর আস্থা রাখা। নিজেকে বিশ্বাস করা। নিজের সামর্থ্যকে চিনতে পারা। কেউ যদি বলে “পারবে না”, সেটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া। বাধা আসবেই, কিন্তু সেই বাধা পেরোনোর শক্তি আমাদের মধ্যেই আছে। নারীর আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার পেছনে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার বাবা যেমন আমাদের শিখিয়েছিলেন শিক্ষকের মর্যাদা, বড় দিদি যেমন দেখিয়েছিলেন সংগ্রামের পথ— তেমনি প্রতিটি মেয়ের উচিত পরিবার থেকে আত্মবিশ্বাসের বীজ সংগ্রহ করা। একই সঙ্গে সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। নারীকে শুধু সংসারের গন্ডিতে আটকে না রেখে, তার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ করে দিতে হবে। তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে সম্মান জানাতে হবে।







