পাহাড় ও কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য বেষ্টিত পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাবিপ্রবি) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভূমিকা রাখছে পার্বত্য অঞ্চলের আমূল পরিবর্তনে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ ক্রমাগত সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের অধীনে পরিচালিত এই বিভাগে প্রতি বছর ৩০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের সমসাময়িক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করছে। রাঙ্গামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং সম্ভাবনাময় পর্যটন সম্পদকে ঘিরে বিভাগটি কাজ করছে সাসটেইনেবল ট্যুরিজম, রুরাল ট্যুরিজম, কালচারাল ট্যুরিজম এবং হসপিটালিটি রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট নিয়ে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ক্যাম্পাসে ‘মিনি ট্যুরিজম হাব’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আতিয়ার রহমান। এই হাব হবে শিক্ষা, গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম যেখানে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনার পাশাপাশি হাতেকলমে পর্যটন ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে। এতে করে তাদের পেশাগত প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হবে এবং স্থানীয় পর্যটন খাতও পাবে দক্ষ মানবসম্পদ।
বিভাগের বর্তমান অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে টেকসই পর্যটন উন্নয়নের কৌশল নিয়ে কথা বলেছেন বিভাগের চেয়ারম্যান মোসা: হাবিবা। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রুথিনা বেসরা।
রুথিনা বেসরাঃ রাবিপ্রবি’র ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।
মোসা: হাবিবাঃ রাবিপ্রবি’র ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগটি দেশের পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। বিভাগটি শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতার সমন্বয়ে গড়ে তুলতে কাজ করছে। আধুনিক কারিকুলাম, গবেষণামুখী শিক্ষা এবং শিল্প-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্ল্যাটফর্ম দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রুথিনা বেসরাঃ সুযোগ-সুবিধার বিচারে এই বিভাগ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় কতটা আলাদা? আলাদা হওয়ার প্রধান কারণগুলো কী?
মোসা: হাবিবাঃ আমাদের বিভাগের অন্যতম শক্তি হলো স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যটন সম্ভাবনার সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগ। বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা, ফিল্ডওয়ার্ক, ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট এবং ইন্টার্নশিপের সুযোগ শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করে।
এছাড়া আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা, দক্ষ ও গবেষণামুখী শিক্ষকবৃন্দ, এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মেন্টরিং ব্যবস্থাও বিভাগটিকে আলাদা করে তোলে। আমরা শুধু ডিগ্রি প্রদান নয়, বরং দক্ষ পেশাজীবী তৈরির উপর গুরুত্ব দিই।
রুথিনা বেসরাঃ শিক্ষার্থীদের বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই বিভাগটিকে গুরুত্ব দেওয়া কেন জরুরি?
মোসা: হাবিবাঃ বর্তমান বিশ্বে পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্প দ্রুত বিকাশমান একটি খাত। বাংলাদেশেও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটনের প্রসার ঘটছে। ফলে এই খাতে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
এই বিভাগে অধ্যয়ন করলে শিক্ষার্থীরা ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা, নেতৃত্বগুণ এবং সেবা-ভিত্তিক পেশাগত মনোভাব অর্জন করে—যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রুথিনা বেসরাঃ এই বিভাগে কোন কোন মুখ্য বিষয় বা কোর্সগুলো পড়ানো হয়?
মোসা: হাবিবাঃ এই বিভাগে ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের মৌলিক ও বিশেষায়িত কোর্সসমূহ পড়ানো হয়, যেমন— ইকো-ট্যুরিজম, রিজেনারেটিভ ট্যুরিজম, মাউন্টেইন ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট, ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট, ট্রাভেল এজেন্সি অ্যান্ড ট্যুর অপারেশনস, ফুড এন্ড বেভারেজ ম্যানেজমেন্ট, ফ্রন্ট অফিস অপারেশনস অ্যান্ড রিজারভেশন, দি আর্ট অ্যান্ড সায়েন্স অফ কালিনারী, গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম/ অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি, এভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট, বায়োডাইভারসিটি কনসারভেসন, ডিজিটাল মার্কেটিং, রিসার্চ মেথডোলজি, একাউন্টিং, মার্কেটিং, রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট ও ফাইন্যান্স সংক্রান্ত কোর্স।এছাড়াও ইন্টার্নশিপ ও গবেষণা প্রকল্প বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে।
রুথিনা বেসরাঃ এই বিভাগ থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ক্যারিয়ার সম্ভাবনা কেমন?
মোসা: হাবিবাঃ এই বিভাগ থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়তে পারে, যেমন— হোটেল ও রিসোর্ট শিল্প, এয়ারলাইন্স ও ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, সরকারি ও বেসরকারি পর্যটন সংস্থা, গবেষণা ও একাডেমিক ক্ষেত্র। এছাড়া উদ্যোক্তা হিসেবে নিজস্ব ট্যুরিজম বা হসপিটালিটি ব্যবসা শুরু করারও সুযোগ রয়েছে।
রুথিনা বেসরাঃ এই বিভাগে ভর্তি হতে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীকে কী কী যোগ্যতা অর্জন করতে হয়?
মোসা: হাবিবাঃ গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে নির্ধারিত মানবিক/ব্যবসায় শিক্ষা/বিজ্ঞান ইউনিটের যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। নির্দিষ্ট জিপিএ মানদণ্ড পূরণ করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয় এবং মেধাক্রমের ভিত্তিতে বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। ভর্তি সংক্রান্ত সর্বশেষ নির্দেশনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী অনুসরণ করতে হয়।
রুথিনা বেসরাঃ বিভাগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন?
মোসা: হাবিবাঃ আমাদের বিভাগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহায়ক সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও ব্যক্তিগত বিকাশে মেন্টরিং ও কাউন্সেলিং প্রদান করি। শিক্ষার্থীরা সহজেই শিক্ষকদের সাথে মতবিনিময় ও পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে—যা একটি ইতিবাচক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে।
রুথিনা বেসরাঃ বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আপনার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাই।
মোসা: হাবিবাঃ বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আমার জন্য গর্ব ও দায়িত্ববোধের বিষয়। শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারা এবং একটি সম্ভাবনাময় বিভাগকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া অত্যন্ত আনন্দের। আমি বিশ্বাস করি, সমন্বিত প্রচেষ্টা, মানসম্মত শিক্ষা এবং গবেষণার মাধ্যমে আমাদের বিভাগ ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
রুথিনা বেসরাঃ আপনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ের জন্য ধন্যবাদ।
মোসা: হাবিবাঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।
পাবলিকিয়ান টুডে/ আয়নুল|ফেসবুক







