ড. এম এম রহমান
মানুষ প্রেমে পড়লে ভাষা হারিয়ে ফেলে, এটি বহুদিনের পুরানো কথা। কিন্তু আধুনিক যুগে ভাষা হারিয়ে ফেললেও ওয়াই-ফাই থাকে, আর সেই ওয়াই-ফাই যদি পৃথিবী থেকে লাখ লাখ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পৌঁছে যায়, তখন প্রেমও হয়ে ওঠে “আউট অব দিস ওয়ার্ল্ড”! সম্প্রতি মহাকাশে আর্টেমিস-২ মিশনের এক হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্ত যেন সেই কথাটাকেই নতুন করে প্রমাণ করল।
২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল, মহাকাশের নিস্তব্ধতায় ভেসে বেড়াতে থাকা এক নভোচারী হঠাৎ করে পৃথিবীতে পাঠালেন একটি রোমান্টিক বার্তা, “Hey babe, I love you from the moon!” তিনি মহাকাশ থেকেই তার প্রেয়সীকে জানিয়ে ফেললেন তার অনুভূতির কথা! না, কোনো কবি নন, কোনো চলচ্চিত্রের নায়কও নন, এই সংলাপের নায়ক হলেন ভিক্টর গ্লোভার, যিনি তখন চাঁদের পথে, পৃথিবী থেকে বহু দূরে। এবছরের ১লা এপ্রিল শুরু হওয়া ১০ দিনের ঐতিহাসিক ‘আর্টেমিস-২’ মিশনে অংশগ্রহণ করেন চারজন সাহসী নভোচারী; ভিক্টর গ্লোভার ছিলেন তাদের একজন। এই মিশনের লক্ষ্য ছিল মহাকাশযানটি সরাসরি চাঁদে অবতরণ করবে না; বরং চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসবে।
আমরা এতদিন “I love you to the moon and back” শুনে অভ্যস্ত। প্রেমিক-প্রেমিকারা বলত, চাঁদ পর্যন্ত ভালোবাসি; যেন চাঁদই ভালোবাসার চূড়ান্ত মাপকাঠি। কিন্তু ভিক্টর গ্লোভার সেই মাপকাঠিকেই এক ধাক্কায় আপডেট করে দিলেন। তিনি আর চাঁদ পর্যন্ত ভালোবাসেন না, তিনি তো সরাসরি চাঁদ থেকেই ভালোবাসছেন! অর্থাৎ, একসময় মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু চাঁদ দেখত, এখন সেই চাঁদের পথে ভেসে চলা মহাকাশযানে বসেই কেউ বলতে পারে, “Hey babe, I love you from the moon.”
বেশি দিন আগের কথা না, প্রেমপত্র পাঠাতে ডাকপিয়নের ওপর ভরসা করতে হতো। তারপর এল মোবাইল ফোন, এসএমএস, ইন্টারনেট, হোয়াটসঅ্যাপ। এখন প্রেমের বার্তা সরাসরি মহাকাশ থেকে আসছে! ভাবা যায়? গ্লোভার যখন তার স্ত্রী ডিওনাকে এই বার্তাটি পাঠান, তখন সেটি ছিল নিছক ব্যক্তিগত ভালোবাসার প্রকাশ। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সেটি মুহূর্তেই হয়ে গেল বৈশ্বিক রোমান্টিকতার প্রতীক। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম—সবখানে মানুষ বলতে শুরু করল, “এটাই তো আসল প্রেম! ডেটা রোমিং চার্জের তোয়াক্কা না করে, চাঁদ থেকেও ভালোবাসা পাঠানো যায়!”
মজার ব্যাপার হলো, এখানে প্রযুক্তি আর অনুভূতি এক অদ্ভুত মিশ্রণ তৈরি করেছে। একদিকে অত্যাধুনিক মহাকাশযান, জটিল কমিউনিকেশন সিস্টেম, হাজারো বৈজ্ঞানিক হিসাব; অন্যদিকে একটি সাধারণ, হৃদয়ছোঁয়া বাক্য: “I love you from the moon!” মহাকাশযানের ভেতরে হয়তো তখন নেভিগেশন, কমিউনিকেশন, কক্ষপথ, ইমার্জেন্সি অক্সিজেন, জ্বালানি—এসব নিয়েই ব্যস্ততা সবার। কিন্তু এর মাঝেই একজন স্বামী তার স্ত্রীর কথা ভেবেছেন। এই মুহূর্তটাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যত দূরেই যাক, প্রিয়জনের জন্য তার অনুভূতি কিন্তু একই থাকে।
প্রাচীনকাল থেকেই, প্রেমের ভাষায় ‘চাঁদ’ একটা রূপক। কিন্তু এখানে সেটা একেবারে বাস্তব। পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার (বা প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫৫ মাইল)। এখন প্রশ্ন হলো, এই দূরত্বে ভালোবাসা কি কমে যায়, নাকি বাড়ে? গ্লোভার প্রমাণ করে দিলেন, দূরত্ব যত বাড়ে, ভালোবাসা তত গভীর হতে পারে, তত বিস্তৃত হতে পারে। কারণ তখন আর পাশে থাকা যায় না, স্পর্শ করা যায় না; হৃদয়ের আকাশে প্রিয়জনের মুখ ভেসে ওঠে, শুধু অনুভব করা যায়। আর অনুভূতির শক্তি যে কতটা, তা বুঝতে হলে মহাকাশে যেতে হয় না, একটা ‘সীন’ হয়ে থাকা মেসেজই যথেষ্ট!
ভিক্টর গ্লোভার-এর বার্তাটি ভাইরাল হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় এক নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। যারা ব্যস্ততার অজুহাতে কোন মেসেজই দিত না, তাদের কেউ কেউ লিখছে, “I love you from the kitchen,” কেউ বলছে, “I love you from the office,” আবার কেউ কেউ সাহস করে লিখছে, “I love you from traffic jam!” অর্থাৎ, এখন ভালোবাসার জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আপনি কোথা থেকে ভালোবাসছেন, সেটাই যেন বড় কথা! একজন আবার মজা করে লিখেছেন, “ভাই, আমি তো এখনো ‘I love you from my room’ লেভেলেই আছি, চাঁদে যেতে আর কতদিন লাগবে?”
গ্লোভার আর ডিওনার এই ছোট্ট মুহূর্তটি আসলে দাম্পত্য জীবনের এক বড় সত্যকে তুলে ধরে। ভালোবাসা মানে শুধু কাছাকাছি থাকা নয়, বরং দূরত্বের মাঝেও সংযোগ বজায় রাখা। একজন মানুষ যখন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে যান, তখন তিনি শুধু একজন বিজ্ঞানী নন, তিনি একজন বাবা, স্বামী, সন্তানও। তার জীবনের প্রতিটি সম্পর্ক তখন নতুন করে পরীক্ষা দেয়। এই একটি বাক্য, “I love you from the moon”, সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ারই এক নিদর্শন।
এখন প্রশ্ন উঠছে, যদি চাঁদ থেকে ভালোবাসা পাঠানো যায়, তাহলে আগামী দিনে কি আমরা মঙ্গলগ্রহ থেকেও এমন বার্তা পাব? হয়তো কোনো একদিন কেউ লিখবে, “Hey babe, I love you from Mars!” তখন হয়তো আমরা বলব, “না ভাই, চাঁদের প্রেমটাই বেশি রোমান্টিক ছিল!” এই বার্তা ও ঘটনা আমাদের শেখায়, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, মানুষের অনুভূতি কখনো বদলায় না। বরং নতুন নতুন মাধ্যম সেই অনুভূতিকে আরও গভীর করে, আরও বিস্তৃত করে। ভিক্টর গ্লোভারের এই ছোট্ট বার্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভালোবাসার জন্য বেশি বেশি শব্দের দরকার নেই, দরকার শুধু আন্তরিকতা, মনে রাখা। আপনি পৃথিবীতে থাকুন বা চাঁদে, আন্তরিকতা থাকলে ভালোবাসা ঠিকই পৌঁছে যায়।
শেষ পর্যন্ত, প্রেমের সবচেয়ে বড় সত্যটা হয়তো এটিই—জায়গা বা দূরত্ব নয়, অনুভূতিই আসল। আর তাই, যদি কখনো কাউকে বলতে ইচ্ছা করে, “আমি তোমাকে ভালোবাসি”, তাহলে জায়গাটা নিয়ে বেশি ভাববেন না। চাঁদে যেতে না পারলেও, বার্তাটা যেন হৃদয় থেকে আসে, তাতেই হবে। ভালোবাসা থাকলেই পৃথিবীটা বাসযোগ্য থাকে। যুদ্ধ, প্রযুক্তি, রাজনীতি—সবকিছুর ভিড়েও মানুষ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে এই এক অনুভূতির কারণেই।
লেখক:
ড. এম এম রহমান
অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত),
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।
ই-মেইল: mijanjkkniu@gmail.com
পাবলিকিয়ান টুডে/ এসএইচ | ফেসবুক







