২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের জন্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার জারি করেছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও পার্লামেন্টারি বিভাগ গতকাল এ–সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে। সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেন। এতে বলা হয়েছে, অধ্যাদেশটি পূর্বপ্রযোজ্য হিসেবে ১ জুলাই ২০২৪ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।
অধ্যাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিপ্লবী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলনের সময় সংঘটিত ঘটনায় দায়ের করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এসব ঘটনার জন্য নতুন করে কোনো মামলা দায়ের করা যাবে না বলেও অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমানে যদি কোনো আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে মামলা বা বিচারাধীন কার্যক্রম চলমান থাকে, তবে সরকারি সার্টিফিকেশন সাপেক্ষে পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকার-নিযুক্ত আইনজীবীর আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালত তাৎক্ষণিকভাবে ওই মামলা প্রত্যাহার করবে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে খালাস বা অব্যাহতি পাবেন বলে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে।
তবে অধ্যাদেশে সব ধরনের কার্যকলাপকে এক কাতারে ফেলা হয়নি। এতে ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধ’ এবং ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ -এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা হয়েছে। অধ্যাদেশে বলা হয়, তৎকালীন সরকারের নির্দেশে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র হামলার মুখে আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এ ধরনের রাজনৈতিক প্রতিরোধে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এই প্রেক্ষাপটে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে একটি ব্যতিক্রমী পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ সরাসরি আদালতে দায়ের করা যাবে না। এ ধরনের অভিযোগ প্রথমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে (NHRC) দাখিল করতে হবে। কমিশন তদন্ত করে নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল কি না।
যদি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে প্রমাণিত হয় যে ঘটনাটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তবে কমিশন ভুক্তভোগীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, যদি তদন্তে দেখা যায় যে হত্যাকাণ্ডটি ব্যক্তিগত স্বার্থে বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সংঘটিত অপরাধ, তাহলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংশ্লিষ্ট আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করবে। আদালত সেই প্রতিবেদনকে পুলিশ রিপোর্ট হিসেবে গণ্য করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারিক কার্যক্রম শুরু করবে।
অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, যদি নিহত ব্যক্তি পুলিশ বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হন, তবে সেই বাহিনীর কোনো বর্তমান বা সাবেক সদস্যকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না, যাতে তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। এ ছাড়া অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সরকার প্রয়োজনে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করতে পারবে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
সর্বোপরি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধ্যাদেশ কেবল একটি আইনি দলিল নয়; এটি একটি রাজনৈতিক রূপান্তরের সাংবিধানিক প্রতিফলন। এই অধ্যাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অতীতের সহিংস বাস্তবতার একটি আইনি ব্যাখ্যা দাঁড় করালেও, এর ন্যায়সংগততা নির্ধারিত হবে প্রয়োগের স্তরে-বিশেষত তদন্তের স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার মাধ্যমে। আইন যখন ইতিহাসের সংকটময় মুহূর্তে হস্তক্ষেপ করে, তখন তা দায়মুক্তির ঢাল না হয়ে ন্যায়বিচারের সেতু হয়ে উঠতে পারে কি না-সেই পরীক্ষার মুখেই আজ এই অধ্যাদেশ।
তরিকুল কবির
সাবেক প্রভাষক, আইন বিভাগ
নটরডেম ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
পাবলিকিয়ান টুডে/ এম | ফেসবুক
