বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) শিক্ষক সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদের মেয়াদ এক বছর ৫ মাস আগে শেষ হলেও নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে করে স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষক সমিতির কার্যক্রম।
সর্বশেষ বুটেক্স শিক্ষক সমিতির ৮ম কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। ওই নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ার্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রিয়াজুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাইদুজ্জামান।

তবে গতবারের নির্বাচনে বর্তমান উপাচার্যের নেতৃত্বাধীন সাধারণ শিক্ষক পরিষদ বিপুল ভোটে পরাজিত হওয়া বলে মনে করছেন কয়েকজন শিক্ষক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন,
“মূলত সমিতির নির্বাচন হলে প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে কোন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে সেই আশংকা থেকেই তারা নির্বাচন দিতে অনীহা দেখাচ্ছে বলে আমার বিশ্বাস।”
নিয়ম অনুযায়ী, এই কার্যনির্বাহী পরিষদের মেয়াদ এক বছর পর শেষ হয়। এ উপলক্ষে ৯ম কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শরফুন নাহার আরজু এবং নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মো. জাহিদুল ইসলামকে।
বুটেক্স শিক্ষক সমিতির নির্বাচন বিধি ও পদ্ধতি সংক্রান্ত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুইজন সদস্য দায়িত্ব প্রাপ্তির ২০ দিনের নির্বাচন সম্পন্ন করবেন।
কিন্তু প্রায় দেড় বছর সময় পার হতে চললেও নির্বাচন আয়োজন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. শরফুন নাহার আরজু বলেন, “শিক্ষক সমিতি রাজনৈতিক সংগঠন না হলেও রাজনৈতিক ব্যাপার তো থাকে”। পূর্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো যে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়নি এমন প্রশ্ন তুলেন তিনি। প্রধান নির্বাচন কমিশন হওয়ার পর কেন শিক্ষক সমিতির নির্বাচন হচ্ছে না এ প্রশ্ন এড়িয়ে উল্টো কেন নির্বাচন দিতে পারছে না তার কারণ সাংবাদিককে বের করতে বলেন এবং সেসময় কেন উনাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে বাছাই করলো ও কতজন শিক্ষক নির্বাচন চায় সেটা তিনি জানতে চান।
নির্বাচন কমিশনারকে কেউ চাপ দিচ্ছে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি এগুলো কিছু বলব না, যেহেতু তুমি সাংবাদিক, স্টাডি করে এসব বের করে দিবে। আমি এমন একজন মানুষ যে আমি কোন দায়িত্ব নিয়ে বসে থাকতে পছন্দ করি না।”
বুটেক্স শিক্ষক সমিতির ৮ম কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ”বর্তমানে দেশের অবস্থা অস্থিতিশীল হওয়ার কারণে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে বিলম্বিত হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই শিক্ষক সমিতির নির্বাচন দিয়ে দিবে। শিক্ষক সমিতি নিঃসন্দেহে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কল্যাণে শিক্ষক সমিতি থাকা দরকার।”
একই কার্যনির্বাহী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. সাইদুজ্জামান বলেন, ”শিক্ষক সমিতির ৮ম কার্যনির্বাহী পরিষদ ১ বছর কালীন মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে সমিতির সাধারণ সভার মাধ্যমে ৯ম কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন গঠন করে দেয়। অতীতের মত মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পরও সমিতির কার্যক্রম চালু না রেখে বরং সমিতির নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হবার সাথে সাথেই দায়িত্ব হস্তান্তর করা ছিল ৮ম কার্যনির্বাহী পরিষদের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। শিক্ষকদের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কাজে একটি প্রতিযোগিতামূলক গতিশীলতার চর্চা শুরু হউক এটাই ৮ম কার্যনির্বাহী পরিষদ চেয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষক সমিতি যেহেতু সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করে, তাই আমি মনে করি শিক্ষক সমিতি গঠন এবং দায়িত্ব হস্তান্তরও সুষ্ঠু ও নিয়মিত হওয়া উচিত। নির্বাচন কমিশন গঠনের পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সমিতির গঠনতন্ত্র মোতাবেক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হয়তো নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজন করতে পারেনি, তবে এখনও নির্বাচন না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। আশা করছি দ্রুততর সময়ের মধ্যে শিক্ষক সমিতির ৯ম কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উন্নয়নমূলক কাজে সক্রিয় সহায়ক ভূমিকা রাখবে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, ”শিক্ষক সমিতির নির্বাচন হওয়া নিয়ে অনেক শিক্ষকরা কথা বলে চলেছেন জুলাই পরবর্তী সময়ে নতুন উপাচার্য আসার পর থেকেই। সেসময় ক্যাম্পাসে রাজনীতিও মাত্র নিষিদ্ধ হয়েছিল তাই নির্বাচনের মাধ্যমে দল নিরপেক্ষ শিক্ষক সমিতি পাওয়ার সুযোগ হবে এই প্রত্যাশাই ছিল অনেক শিক্ষকের। এরপর নির্বাচন কমিশন গঠিত হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সমিতির নির্বাচন আয়োজন করা নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিশ্চুপ থাকতো এবং এই বিষয়ে তার দায়িত্বহীনতা দেখা যেতো। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনার আগ্রহ দেখালেও তাকে সাহায্য করা হয়নি ও দুর্ব্যবহারের সম্মুখীন হতে হয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছ থেকে।”
ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. ইমদাদ সরকার বলেন, ”বুটেক্সের শিক্ষক সমাজের ঐক্য রক্ষা, পেশাগত অধিকার আদায় এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষক সমিতি একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। শিক্ষক সমিতি প্রশাসন ও শিক্ষকের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার সংকট নিরসন করে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, পূর্ববর্তী সমিতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করা হলেও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও নির্বাচন আয়োজনে কার্যকর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সাধারণ শিক্ষকবৃন্দ ইতোপূর্বে একাধিকবার নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে বর্তমান প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব এবং উদাসীনতায় এই প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।”
পাবলিকিয়ান টুডে/ এম | ফেসবুক
