রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় সৃষ্টি হয়েছে চরম শোক ও উৎকণ্ঠার পরিবেশ। বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে, আর নিখোঁজ রয়েছেন আরও বহু যাত্রী। উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে ৩০০ টাকা ভাড়া দিয়ে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে উঠেছিলেন দৌলতদিয়ার সৈদালপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবদুস সালাম। তবে ঘাটে ফেরি আসতে দেরি হওয়ায় তিনি বাস থেকে নেমে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। দুর্ঘটনার পর রাতে ফেরিঘাট এলাকায় তাঁকে পাওয়া যায়। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, বাসটি তখন পন্টুনে ওঠার সড়কে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক সেই সময় একটি ফেরি ঘাটে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ বাসটি চলতে শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। তাঁর ভাষায়, চালক সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বাসটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাননি।
ঘটনার সময় বাসটিতে নারী ও শিশুসহ প্রায় ৪০ জন যাত্রী ছিলেন বলে প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা। এর মধ্যে ৬ থেকে ৭ জন যাত্রী ফেরির অপেক্ষায় বিরক্ত হয়ে আগেই বাস থেকে নেমে গিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়দের সহায়তায় চারজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে দুজনকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন এবং অপর দুজন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এখনো প্রায় ৩০ জন যাত্রী বাসের ভেতর আটকা পড়ে থাকতে পারেন বা নিখোঁজ রয়েছেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার সাংবাদিকদের জানান, দুর্ঘটনার পরপরই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফোন করে খোঁজখবর নিয়েছেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি ঘটনাটির অগ্রগতি নিয়মিতভাবে তাঁকে অবহিত করার কথাও বলা হয়েছে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক। এই কমিটিতে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) এবং পুলিশের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। কমিটি ঘটনাটির কারিগরি, ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন দেবে।
নিহতদের একজন হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী রেহেনা আক্তার। তাঁর বাড়ি রাজবাড়ীর ভবানীপুর এলাকায়। ঈদের ছুটি শেষে তিনি ঢাকার মিরপুরে নিজ বাসায় ফিরছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মেয়ে স্বাভা, যিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক; ছোট ছেলে রাইয়ান তোতন, যিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী; এবং তাঁর একমাত্র নাতি। দুর্ঘটনার সময় তাঁরা সবাই বাসের ভেতরে বসা ছিলেন। পরে মেয়ের সাহসী প্রচেষ্টায় বাসের জানালা ভেঙে রেহেনা আক্তারকে বাইরে বের করে আনা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
রেহেনা আক্তারের ভাই, কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আউয়াল আনোয়ার জানান, পরিবারের সদস্যরা ঈদের ছুটি কাটিয়ে একসঙ্গে ঢাকায় ফিরছিলেন। বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পর তাঁর ভাগনি স্বাভা অনেক চেষ্টা করে মাকে উদ্ধার করেন এবং দ্রুত গোয়ালন্দ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থাও তখন অনিশ্চিত ছিল।
দুর্ঘটনার আরেকটি মর্মান্তিক দিক উঠে এসেছে নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের আর্তনাদে। কালুখালী উপজেলার মদাপুর এলাকার বাসিন্দা তরুণ আশরাফুল আলম এই বাসেই ঢাকায় ফিরছিলেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তাঁর বাবা দ্রুত ঘাটে ছুটে আসেন এবং সেখানে সন্তানের খোঁজে বিলাপ করতে থাকেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে আবার কর্মস্থলে ফেরার জন্য ছেলে বিদায় নিয়েছিল। সেই বিদায়ই যে শেষ বিদায় হয়ে যাবে, তা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।
ঘাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন জানান, বিকেল পাঁচটার কিছু পর বাসটি দৌলতদিয়ার তিন নম্বর ঘাটে এসে পৌঁছায়। সে সময় একটি বড় ফেরি যানবাহন নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ায় বাসটি সেটিতে উঠতে পারেনি এবং পরবর্তী ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। পরে সোয়া পাঁচটার দিকে ‘হাসনা হেনা’ নামের একটি ছোট ইউটিলিটি ফেরি ঘাটে ভেড়ার সময় পন্টুনে সজোরে আঘাত করে। এই ধাক্কার প্রভাবেই বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে ছিটকে পড়ে পদ্মা নদীতে।
মনির হোসেন বলেন, চোখের সামনে পুরো ঘটনাটি ঘটে গেল, কিন্তু কিছুই করার সুযোগ ছিল না। বাসে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৪০ জন যাত্রী ছিলেন। কয়েকজন যাত্রী সাঁতরে বা ভেঙে বের হতে পারলেও অধিকাংশই বাসের ভেতর আটকা পড়ে যান।
এদিকে, দুর্ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ঘটনাটির ভয়াবহতা নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ঘাটজুড়ে স্বজনহারা মানুষের কান্না, উদ্বেগ আর অপেক্ষার দীর্ঘ ছায়া নেমে এসেছে। উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে শঙ্কা—নিখোঁজদের অনেকেই হয়তো আর জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবেন না।
পাবলিকিয়ান টুডে/ এ| মূলসূত্র: প্রথম আলো







