গতকাল (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টা ৫১ মিনিটে মিয়ানমারে ৫.১ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা ঢাকার আগারগাঁও আবহাওয়া অফিস থেকে প্রায় ৪৬২ কিলোমিটার দূরে ছিল। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তি ভূপৃষ্ঠের ১২৯ কিলোমিটার গভীরে এবং এর তীব্রতা ছিল ৫.১ মাত্রা। এই কম্পন রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয় এবং অনেক বাসিন্দা তা টের পাওয়ার কথা জানান। যদিও এই ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, এটি আবারও বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূমিকম্প ঝুঁকির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
মিয়ানমারে ৭.৭ মাত্রার এবং থাইল্যান্ডে ৮.২ মাত্রার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প বাংলাদেশকেও কাঁপিয়ে গেছে, রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ৫৯৭ কিলোমিটার দূরে ছিল এর উৎপত্তিস্থল। এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত এবং ভূতাত্ত্বিক ও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোন এবং ডাউকি ফল্টে সঞ্চিত শক্তি যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় ভূমিকম্পের সৃষ্টি করতে পারে।
১৯১৮ সালে তৎকালীন বাংলা অঞ্চলে ৮.০ মাত্রার একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল, যাতে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায় এবং ভূতত্ত্ববিদদের মতে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প প্রায় ১০০ বছরের ব্যবধানে হয়ে থাকে। সেই হিসেবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ২০২৩ সালেই সেই সময়সীমা অতিক্রম করেছে এবং এই সময়সীমা অতিক্রম করার পাশাপাশি ছোট ছোট ভূমিকম্পের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশে ২৮টি, ২০২৩ সালে ৪১টি এবং ২০২৪ সালে ৫৪টি ছোট ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে যা একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ৫.১ মাত্রার সর্বশেষ ভূমিকম্পটিও সেই ক্রমবর্ধমান তালিকারই একটি সংযোজন, যা উপেক্ষা করার মতো নয়।
ছোট ভূমিকম্প কি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস? এই বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুই ধরনের মত রয়েছে। সিসমিক গ্যাপ থিওরি অনুযায়ী ছোট ছোট ভূমিকম্প ভূ-পৃষ্ঠের কিছু চাপ সঞ্চিত শক্তি নির্গত করে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে পারে যেমন ক্যালিফোর্নিয়ার সান আন্দ্রেয়াস ফল্টের ক্ষেত্রে ছোট ভূমিকম্প ৬.০ মাত্রার বেশি ভূমিকম্পের ঝুঁকি ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমিয়েছে বলে একটি গবেষণায় দেখা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডাউকি ফল্টে প্রতিবছর ১.৬ সেন্টিমিটার হারে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে অথচ ৪.০ মাত্রার চেয়ে ছোট ভূমিকম্পগুলো এই সঞ্চিত শক্তির মাত্র ০.০১ শতাংশ নির্গত করতে পারে। একটি বড় ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে হলে এই শক্তি নির্গমনের জন্য ২০০ বছর সময় প্রয়োজন যা বাস্তবসম্মত নয়।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য বলছে জাপানের টোহোকু এবং ক্যালিফোর্নিয়ার রিজক্রেস্ট ভূমিকম্পের আগে যথাক্রমে ২০টির বেশি এবং ৩০০টির বেশি ছোট ছোট কম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ইন্দো-বার্মা অঞ্চলের যে অংশটি আটকে আছে সেখানে গত ৫০০ বছরে কোনো বড় ভূমিকম্প হয়নি, যার অর্থ এখানে যেকোনো সময় ৮.০ মাত্রার বা তার বেশি ভূমিকম্প হতে পারে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে এই অঞ্চলে প্রতি দশকে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা ২৩ শতাংশ হারে বেড়ে চলেছে।
বাংলাদেশের চারটি প্রধান ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে উত্তর-পূর্ব অঞ্চল বা ডাউকি ফল্ট। এই ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রিভার্স ফল্টটি অত্যন্ত সক্রিয় এবং এই ফল্টের কারণেই ১৮৯৭ সালে গ্রেট আসাম ভূমিকম্প হয়েছিল, যার ফলে সিলেট অঞ্চলে মাটি তরলীভবনের ঘটনা ঘটে এবং ২০০ জনের বেশি মানুষ মারা যান। বর্তমানে এখানে ৭.৫ মাত্রার বেশি ভূমিকম্পের সম্ভাবনা ৩০ শতাংশ বলে জানিয়েছে জার্নাল অব এশিয়ান আর্থ সায়েন্সেস এবং এই অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প হলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দ্বিতীয় সবচেয়ে উদ্বেগজনক অঞ্চল হলো দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল বা ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোন, যেখানে ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট বার্মিজ প্লেটের নিচে প্রতি বছর ৪৬ মিলিমিটার হারে ধসে পড়ছে। এখানে ৮.২ থেকে ৮.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ৯ মিটার উঁচু সুনামি সৃষ্টি করতে পারে, যা কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিতে পারে।
তৃতীয় অঞ্চলটি হলো মধ্যাঞ্চল বা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ অঞ্চল, যা দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এবং ঝুঁকির দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ। রাজউকের তথ্য অনুযায়ী ঢাকার ৮২ শতাংশ ভবন ভূমিকম্প সহনীয় নয় এবং বুয়েটের ভূতত্ত্ব বিভাগ সতর্ক করে দিয়েছে যে ঢাকায় ৬.০ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হলে বুড়িগঙ্গার নরম পলিমাটি তরলীভূত হয়ে যেতে পারে, যার ফলে শহরের ৭০ শতাংশ ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ঢাকাকে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে।
চতুর্থ অঞ্চলটি হলো উপকূলীয় অঞ্চল বা সুন্দরবন-সেন্টমার্টিন অঞ্চল, যেখানে সমুদ্রগর্ভস্থ ফল্ট ও প্রবালপ্রাচীরের নিচে থাকা ফাটলগুলোর কারণে ২০০৪ সালের সুনামির মতো আরেকটি দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে। সুন্দরবন এই সুনামির কিছুটা সুরক্ষা দিলেও খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঢাকার জন্য বিশেষ ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা জিআইজি-জাপান তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে ঢাকায় যদি ৭.০ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে এবং মৃত্যু হতে পারে ২১ মিলিয়ন মানুষের, যা দেশের বর্তমান জনসংখ্যার একটি বড় অংশ। শুধু ভবন ধসেই নয়, ভূমিকম্পের পর গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে আগুন লাগা, পানির পাইপ ভেঙে তৃষ্ণার্ত মানুষ ও উদ্ধার কাজে ব্যাঘাত ঘটানো, উড়াল সড়ক ধসে পড়া এই সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হবে কল্পনাতীত। ফায়ার সার্ভিসের সাভারের ঘটনার উদাহরণ টেনে বলা যায় একটি ভবন ধসে পড়ার পর সেখান থেকে মানুষ উদ্ধার করতে ৭ দিন লেগেছিল, যদি ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়ে তাহলে উদ্ধারকাজ কতটা দুরূহ হবে তা সহজেই অনুমেয়।
সাম্প্রতিক গবেষণার ভয়াবহ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় গুটেনবার্গ-রিখটার সূত্র অনুযায়ী সাধারণত ৩.০ মাত্রার ১০০০টি ভূমিকম্পের বিপরীতে ৬.০ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়ে থাকে, কিন্তু বাংলাদেশে ২০২৩ সালে ৩.০ মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা গড়ের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেশি ছিল যা স্বাভাবিক নিয়মের ব্যতিক্রম এবং বিপদের ইঙ্গিত দেয়। নেচার কমিউনিকেশনসের এক গবেষণায় বলা হয়েছে ইন্দো-বার্মা অঞ্চল প্রতি বছর ৩.৫ মিটার সমতুল্য শক্তি সঞ্চয় করছে যা ছোট ভূমিকম্পগুলো নির্গত করতে পারছে না এবং এই সঞ্চিত শক্তি যখন একবার মুক্তি পাবে তা হবে ধ্বংসাত্মক। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে বাংলাদেশে ৮.০ মাত্রার বেশি ভূমিকম্পের সম্ভাবনা প্রতি বছর ২ শতাংশ হারে বেড়েই চলেছে, যা একটি গাণিতিক সম্ভাবনা হলেও দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে।
পরিশেষে এটা মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে আমরা ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারব না কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচতে প্রস্তুতি নিতেই হবে। গতকাল রাতের ৫.১ মাত্রার ভূমিকম্পটি একটি মৃদু কম্পন মাত্র, কিন্তু এটি সেই বড় দুর্ভোগের বার্তাবাহক হতে পারে যদি আমরা এখনই সচেতন না হই। জাপানের টোনানকাই মডেল দেখিয়েছে ইন্দো-বার্মা অঞ্চলে ৮.০ মাত্রার বেশি ভূমিকম্পের সম্ভাবনা প্রতিবছর দেড় শতাংশ হারে বাড়ছে এবং এই সম্ভাবনা মাথায় রেখে আমাদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। ঢাকাসহ সারা দেশে নতুন ভবন নির্মাণে জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে, গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত ভূমিকম্প প্রশিক্ষণ ও মহড়ার আয়োজন করতে হবে, প্রতিটি বাড়ি ও মহল্লার জন্য জরুরি যোগাযোগ ও উদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানি, ওষুধ, টর্চ, ব্যাটারি সব সময় মজুত রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে ভূমিকম্প মানুষকে হত্যা করে না, হত্যা করে আমাদের তৈরি করা দুর্বল ভবন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অপ্রস্তুতি, তাই এখনই সচেতন না হলে অপেক্ষার প্রহর শেষ হলে এর মূল্য দিতে হবে প্রাণ দিয়ে।
পাবলিকিয়ান টুডে/ অর্ঘ্য|







