গণতান্ত্রিক উৎসবের দিনে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে দেখা গেল এক আবেগঘন দৃশ্য। ৮৯ বছর বয়সী মোতাহারুল চৌধুরী নাতি–নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলেন ভোটকেন্দ্রে। বয়সের ভার, শারীরিক সীমাবদ্ধতা—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। পরিবারের নতুন প্রজন্মকে পাশে নিয়েই তিনি প্রয়োগ করলেন নিজের ভোটাধিকার। ভোট শেষে তার কণ্ঠে ছিল সন্তুষ্টির সুর—“পুরো পরিবার নিয়ে ভোট দিতে এসেছি। পরিবেশ ভালো, শান্তিপূর্ণ।”
ঢাকা–৯ আসনের ভোটার মোতাহারুল চৌধুরী সকালেই খিলগাঁও মডেল কলেজ কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেন। তার সঙ্গে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে আসেন নাতি ওয়াহিদ চৌধুরী (২৮) ও নাতনি নানজীবা চৌধুরী (২২)। খিলগাঁও ঝিলপাড়ের বাসিন্দা এই দুই তরুণ ভোটার জীবনের প্রথম নির্বাচনে অংশ নিলেন দাদাকে পাশে নিয়েই। কেন্দ্র প্রাঙ্গণে তিন প্রজন্মের একসঙ্গে উপস্থিতি অনেকের দৃষ্টি কাড়ে।প্রথমবার ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে নানজীবা বলেন, ভোটের পরিবেশ ছিল নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক। কেন্দ্রে প্রবেশ থেকে ভোট প্রদান পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি তার কাছে সুশৃঙ্খল মনে হয়েছে।
নাতি ওয়াহিদ চৌধুরী বলেন, ঢাকা–৯ আসনে প্রার্থীরা ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন এবং ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যেই প্রার্থী বিজয়ী হোন না কেন, তিনি যেন এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেন। “আমরা চাই উন্নয়ন হোক, সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হোক”—যোগ করেন তিনি।
মোতাহারুল চৌধুরীর কাছে এবারের ভোট ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ জীবনে বহু নির্বাচন দেখেছেন তিনি। তবে এবার নাতি–নাতনিকে পাশে নিয়ে ভোট দিতে পারা তার জন্য এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। পরিবার থেকে ভোটের গুরুত্ব শেখানো উচিত বলেও মত দেন তিনি।
ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, সকাল থেকেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। প্রবীণ ও নারী ভোটারদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো, ফলে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছেন।
এদিকে রাজধানীর বাইরে ফেনীতেও দেখা গেছে এক মানবিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক দৃশ্য। ছাগলনাইয়ার মুহুরীগঞ্জ হাইস্কুল কেন্দ্রে নাতির কোলে করে এসে ভোট দিয়েছেন শতবর্ষী জয়নব বিবি। বয়সের কারণে হেঁটে চলা তার জন্য কষ্টকর হলেও ভোট দেওয়ার আগ্রহ তাকে কেন্দ্রে নিয়ে আসে। নাতি সোহাগ বাড়ি থেকে টমটমে করে তাকে কেন্দ্রে আনেন। পরে নাতির কোলে ভর করে তিনি নারী বুথে যান এবং সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার সহযোগিতায় ভোট প্রদান করেন।

ভোট দিতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করে জয়নব বিবি বলেন, জীবনে আগে কখনো কেন্দ্রে এসে ভোট দিতে পারেননি। এবার সুযোগ পেয়ে তিনি খুবই খুশি। তার এই অংশগ্রহণ কেন্দ্রের অন্য ভোটারদের মাঝেও উৎসাহ সৃষ্টি করে।
মুহুরীগঞ্জ হাইস্কুল কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা জাফর আহাম্মদ জানান, শতবর্ষী এই ভোটার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। কেন্দ্রজুড়ে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ছিল স্বাভাবিক ও নিরপেক্ষ।
রাজধানী থেকে জেলা শহর—বিভিন্ন স্থানে প্রবীণ ভোটারদের এমন অংশগ্রহণ এবারের ভোটকে দিয়েছে এক আলাদা মাত্রা। বিশেষ করে ঢাকায় ৮৯ বছরের মোতাহারুল চৌধুরীর নাতি–নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে ভোট দেওয়া যেন প্রজন্মান্তরের বন্ধন ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তরুণদের প্রথম ভোট এবং প্রবীণদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মিলনে এবারের ভোট উৎসব হয়ে উঠেছে স্মরণীয়।
পাবলিকিয়ান টুডে/ এ| মূলসূত্র: প্রথম আলো







