মানুষ কি কখনো অমর হতে পারবে? এই প্রশ্ন দর্শন, ধর্ম ও বিজ্ঞানের ইতিহাসে বহুবার উঠেছে। আধুনিক জীববিজ্ঞানের আলোচনায় এই প্রশ্নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গেছে একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গঠন টেলোমিয়ার ।
টেলোমিয়ার কী?
মানবদেহ অসংখ্য কোষ দিয়ে গঠিত। প্রতিটি কোষের কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস, আর নিউক্লিয়াসের ভিতরে প্যাঁচানো কুণ্ডলী আকারে অবস্থান করে ক্রোমোজোম। ক্রোমোজোম মূলত DNA দিয়ে তৈরি, যেখানে আমাদের জিনগত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। প্রতিটি ক্রোমোজোমের একেবারে শেষ প্রান্তে DNA-র একটি বিশেষ অংশ থাকে, এটিই হলো টেলোমিয়ার।
মানুষের দেহকোষে মোট ৪৬টি ক্রোমোজোম রয়েছে। প্রতিটি ক্রোমোজোমের দুটি প্রান্ত থাকায় মোট টেলোমিয়ারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯২টি।
টেলোমিয়ারের কাজ কী?
টেলোমিয়ারের প্রধান কাজ হলো ক্রোমোজোমকে সুরক্ষা দেওয়া। এটি নিশ্চিত করে যেন এক ক্রোমোজোম অন্যটির সঙ্গে জোড়া লেগে না যায় বা DNA ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
একটি সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। আমরা সবাই জুতার ফিতা চিনি। ফিতার দুই প্রান্তে ছোট প্লাস্টিকের আবরণ থাকে, যাকে বলে aglet। যদি এটি না থাকে, ফিতা ছিঁড়ে যায় এবং জট পাকিয়ে যায়। ঠিক তেমনই, টেলোমিয়ার ক্রোমোজোমের জন্য সুরক্ষামূলক আবরণ হিসেবে কাজ করে।
টেলোমিয়ার ও বার্ধক্যের সম্পর্ক
মানবদেহে প্রতিনিয়ত কোষ বিভাজন ঘটে। এই বিভাজনের সময় DNA নিজের অনুলিপি তৈরি করে—একে বলা হয় DNA রেপ্লিকেশন। কিন্তু DNA-র শেষ প্রান্ত পুরোপুরি কপি করা সম্ভব হয় না। কারণ রেপ্লিকেশন শুরু করতে যে প্রাইমার (Primer) প্রয়োজন, DNA-র একেবারে শেষ অংশে সেটি বসার জায়গা পায় না।
ফলস্বরূপ, প্রতিটি কোষ বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে DNA-র শেষ অংশ সামান্য করে ছোট হয়ে যায়।
একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক: কল্পনা করুন, আপনি যদি ঘরের মেঝে রং করতে শুরু করেন, একসময় এমন একটি জায়গা আসে যেখানে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে রং করা সম্ভব হয় না। ঠিক তেমনভাবেই DNA-র শেষ প্রান্ত প্রতিবার “রংহীন” থেকে যায়।
যেহেতু এই ক্ষয় সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ জিনকে আঘাত করে না, বরং টেলোমিয়ার-কে প্রভাবিত করে, তাই প্রতিটি কোষ বিভাজনের সঙ্গে সঙ্গে টেলোমিয়ারের দৈর্ঘ্য ক্রমশ কমতে থাকে। এক পর্যায়ে টেলোমিয়ার এত ছোট হয়ে যায় যে কোষ আর বিভাজন করতে পারে না। তখন কোষ বার্ধক্যপ্রবণ হয়ে যায় বা মারা যায়। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় টেলোমিয়ার শর্টেনিং, যা বার্ধক্যের একটি প্রধান জৈবিক কারণ।
অমর কোষ কি আছে?
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের দেহে কিছু কোষ কার্যত “অমর”। ডিম্বাণু এবং শুক্রাণুতে থাকে একটি বিশেষ এনজাইম, টেলোমারেজ । এই এনজাইম টেলোমিয়ার ক্ষয় হলে সেটিকে আবার আগের দৈর্ঘ্যে ফিরিয়ে আনে।
কিন্তু সাধারণ দেহকোষে টেলোমারেজের কার্যকারিতা অত্যন্ত কম বা প্রায় অনুপস্থিত। ফলে দেহকোষের টেলোমিয়ার ক্রমাগত ছোট হতে থাকে, আর আমরা ধীরে ধীরে বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাই।
মানুষ কেন অমর নয়?
ডিম্বাণু বা শুক্রাণু প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকতে পারে, কিন্তু পুরো মানবদেহ অমর হতে পারে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যদি নিয়ন্ত্রিতভাবে দেহকোষে টেলোমারেজ সক্রিয় করা যায়, তাহলে বার্ধক্য প্রক্রিয়া ধীর করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এর সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকিও জড়িত, কারণ ক্যান্সার কোষেও টেলোমারেজ অত্যন্ত সক্রিয় থাকে। তাই, টেলোমিয়ার আমাদের অমরত্বের চাবিকাঠি, তবে সেই চাবি ব্যবহার করার ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
বিশ্বজুড়ে গবেষকরা টেলোমিয়ার এবং টেলোমারেজ নিয়ে নতুন গবেষণা চালাচ্ছেন। এই গবেষণা কেবল বার্ধক্য বিলম্ব নয়, ক্যান্সার এবং অন্যান্য জটিল রোগ প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ। টেলোমিয়ার এবং টেলোমারেজের রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে মানুষের জীবনকাল এবং স্বাস্থ্যমান বৃদ্ধি সম্ভব হতে পারে।
পাবলিকিয়ান টুডে/ অর্ঘ্য|







