যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতায় এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে ষষ্ঠ প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান F-47। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিমানটিকে এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া সবচেয়ে বিধ্বংসী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ফাইটার জেট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) বার্ষিক সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, এই যুদ্ধবিমান যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ আধিপত্যকে দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করবে।
বিমানটির নামকরণ নিয়েও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, “ওরা এর নাম দিয়েছে 47। যদি আমার এটা পছন্দ না হয়, আমি 47 নাম্বারটা তুলে দেব। ভাবছি, কেন ওরা 47 নাম রেখেছে? কিন্তু যদি আমার পছন্দ না হয়, তাহলে আমি 47 বাদ দেব।” তার এই মন্তব্য সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
পেন্টাগনের তথ্যমতে, F-47 যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এয়ার সুপিরিয়রিটি কৌশলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলো যখন দ্রুত তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তখন এই নতুন প্রজন্মের জেটকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প বিমানটিকে ‘সুপার-কম্পিউটার সদৃশ’ আকাশযান আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি কেবল একটি যুদ্ধবিমান নয়, বরং আকাশযুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি চলমান কমান্ড সেন্টার।
F-47 যুক্তরাষ্ট্রের ‘নেক্সট জেনারেশন এয়ার ডমিন্যান্স’ (NGAD) কর্মসূচির অংশ, যার লক্ষ্য একক যুদ্ধবিমানের সীমা ছাড়িয়ে একটি সমন্বিত ও নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক যুদ্ধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই ব্যবস্থায় F-47 মূল যুদ্ধবিমান হিসেবে কাজ করবে এবং এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে একাধিক ‘কলাবরেটিভ কমব্যাট এয়ারক্রাফট’ (CCA)। এসব স্বয়ংক্রিয় ড্রোন নজরদারি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং আক্রমণ পরিচালনায় সহায়তা করবে। পাইলট চাইলে সরাসরি এসব ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় অপারেশনও চালানো যাবে।
উন্নত স্টেলথ প্রযুক্তির কারণে F-47 শত্রুপক্ষের রাডার ও সেন্সর ব্যবস্থায় প্রায় অদৃশ্য থেকে অভিযান পরিচালনা করতে পারবে। বিমানটির গায়ে ব্যবহৃত বিশেষ আবরণ, অভ্যন্তরীণ অস্ত্রবাহী ব্যবস্থা এবং উন্নত বায়ুগতিবিদ্যা রাডার প্রতিফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। ককপিটের সামনে সংযুক্ত ছোট ডানা বা ক্যানার্ড ব্যবহারের ফলে এটি উচ্চগতিতে দ্রুত দিক পরিবর্তন ও জটিল ম্যানুভার সম্পাদনে সক্ষম, যা আধুনিক ডগফাইট পরিস্থিতিতে বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই যুদ্ধবিমানের অপারেশনাল রেঞ্জ এক হাজার নটিক্যাল মাইলেরও বেশি বলে জানানো হয়েছে। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালীকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
F-47–এর নকশায় বোয়িংয়ের পরীক্ষামূলক স্টেলথ বিমান YF-118G Bird of Prey–এর কিছু প্রযুক্তিগত ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোণাকৃতির ডানা, বাঁকানো নাকের নকশা এবং উন্নত স্থিতিশীলতা ব্যবস্থা। পূর্ববর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের তুলনায় এটি বেশি পাল্লার, দ্রুত মোতায়েনযোগ্য এবং বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী এই যুদ্ধবিমান নির্মাণের দায়িত্ব দেয় বোয়িংকে। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক বিমান নির্মাণে লকহিড মার্টিনের আধিপত্য থাকায় এই চুক্তিকে বোয়িংয়ের জন্য একটি বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প বলেন, “আমরা এমন কিছু তৈরি করছি, যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি। এটি আমাদের শত্রুদের কাছে স্পষ্ট বার্তা—আকাশে আমাদের ধারেকাছেও কেউ নেই।”
সামরিক বিষয়ক ওয়েবসাইট The War Zone–এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, F-47 নামটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিখ্যাত P-47 Thunderbolt যুদ্ধবিমানের প্রতি ইঙ্গিত করে। পাশাপাশি ‘47’ সংখ্যা ১৯৪৭ সালকেও নির্দেশ করে, যে বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী সেনাবাহিনী থেকে পৃথক হয়ে একটি স্বাধীন বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রাজনৈতিক দিক থেকেও নামটির একটি প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে, কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম এবং বর্তমানে ৪৭তম প্রেসিডেন্ট।
মার্কিন বিমান বাহিনী জানিয়েছে, F-47–এর একটি পরীক্ষামূলক সংস্করণ গত পাঁচ বছর ধরে গোপনে পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। বাহিনী অন্তত ১৮৫টি যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। প্রথম ব্যাচ ২০২৮ সালের মধ্যে আকাশে উড়বে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় মোতায়েনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি বিমানের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে, যা একে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমানের একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
পাবলিকিয়ান টুডে/ এ| মূলসূত্র: যুগান্তর







