২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর এই প্রথম ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনায় বসেছে। তবে যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে থাকছে ভূখণ্ড ইস্যু। ক্রেমলিন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা দখল করা কোনো ভূখণ্ড ছাড়তে প্রস্তুত নয়। ফলে কিয়েভের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লেও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতা আদৌ কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে শুরু হয় এই আলোচনা। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই তিন পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের পরিচিত বৈঠক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আলোচনার সময়টি এমন এক বাস্তবতায় এসেছে, যখন রুশ হামলায় ইউক্রেনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি তীব্র শীতের মধ্যে পড়েছে, আর পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যেও রাজনৈতিক টানাপোড়েন স্পষ্ট।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আলোচক পর্যায়ে তিন পক্ষের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন এবং এই ধরনের ফরম্যাট অনেকদিন পর দেখা গেল। সাংবাদিকদের পাঠানো এক ভয়েস নোটে তিনি বলেন, “কিয়েভের প্রতিনিধি দল কী করতে হবে, তা জানে।”
রাশিয়া এই আলোচনায় তাদের প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ-এর প্রধান অ্যাডমিরাল ইগর কস্ত্যুকভের নেতৃত্বে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বোঝা যাচ্ছে আলোচনার মূল ফোকাস রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়েই বেশি।
এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হওয়ার আগে মস্কোয় ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে সপ্তম দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইউক্রেনের ভূখণ্ড ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। ওই সফরে উইটকফের সঙ্গে ছিলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ফেডারেল অ্যাকুইজিশন সার্ভিসের কমিশনার জশ গ্রুনবাউম।
ক্রেমলিনের কূটনৈতিক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানান, আলোচনাকে সব দিক থেকেই ফলপ্রসূ মনে হয়েছে এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে একটি ত্রিপক্ষীয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যার প্রথম বৈঠকও আবুধাবিতেই হবে।
তবে আলোচনার ঠিক আগে আবারও কঠোর বার্তা দেয় মস্কো। ক্রেমলিন দাবি করে, যুদ্ধ শেষ করতে হলে কিয়েভকে অবশ্যই পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। রাশিয়ার একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আরও শর্ত আরোপের কথাও বলেছেন, যা আগে আলোচিত শান্তি প্রস্তাবগুলোর মধ্যেও ছিল না। এসব বক্তব্যে কিয়েভে সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিতও মিলেছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, “ইউক্রেন রাষ্ট্রের অবশিষ্ট অংশে বর্তমান নাৎসি শাসন টিকিয়ে রাখার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি যেকোনো সমঝোতা প্রস্তাব আমাদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।”
ইউরোপীয় দেশগুলোও মস্কোর অবস্থান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে। জার্মান সরকারের মুখপাত্র স্টেফেন মেয়ার বলেন, রাশিয়া তার সর্বোচ্চ দাবির অবস্থান থেকে আদৌ কতটা সরে আসতে প্রস্তুত, তা এখনো বড় প্রশ্ন। তিনি বলেন, এমন কোনো শান্তিচুক্তির কোনো অর্থ নেই, যা রাশিয়াকে সাময়িক স্বস্তি দিয়ে ভবিষ্যতে নতুন হামলার সুযোগ করে দেবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আলোচনার পূর্ণ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। রুশ ও ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বৈঠকে বসবেন কি না, সেটিও অনিশ্চিত। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আলোচনা দুই দিন চলবে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “দনবাস অঞ্চল থেকে ইউক্রেন ও ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীকে সরে যেতে হবে—এ বিষয়ে রাশিয়ার অবস্থান সুপরিচিত। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।”
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন সক্রিয়ভাবে শান্তিচুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে ঘন ঘন যাতায়াত করছেন। তবে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এতে ইউক্রেনকে প্রতিকূল কোনো সমঝোতায় বাধ্য করা হতে পারে।
বুধবার ট্রাম্প বলেন, পুতিন ও জেলেনস্কি যদি একসঙ্গে বসে চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন, তাহলে তারা হবে বোকা। দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্টিভ উইটকফ জানান, শান্তি আলোচনায় এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যদিও তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
পাবলিকিয়ান টুডে/ এসএইচ | ফেসবুক
