সুতা আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ ও বন্ড সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে দেশের পোশাক ও বস্ত্র খাতের শীর্ষ সংগঠনগুলো। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে গত পাঁচ মাসে বিশ্বের ২৬টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের তুলনায় কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নিট পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ করা হলে উৎপাদন খরচ বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে পোশাকের দামে, ফলে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন। তাঁদের মতে, স্পিনিং মিল রক্ষার নামে সুতা আমদানি সীমিত করা হলে নিটিং, ডাইং এবং গার্মেন্টস খাত বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
অন্যদিকে বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, শিল্পটি ইতোমধ্যে সংকটে রয়েছে। নানা কারণে প্রায় ৫০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং বস্ত্রকলগুলোতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। তাঁদের দাবি, দেশীয় বস্ত্রশিল্প টিকিয়ে রাখতে সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল করা জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) গত ২৯ ডিসেম্বর ভারত থেকে আমদানি কমানোর লক্ষ্যে ১০-৩০ কাউন্টের কটন ও ব্লেন্ডেড সুতা আমদানিতে ২০ শতাংশ সেফগার্ড শুল্ক আরোপ বা বন্ড সুবিধা বাতিলের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দেয়।
বিটিএমএর আবেদনের পর ৫ জানুয়ারি ট্যারিফ কমিশন সংগঠনটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। পরদিনই কমিশন ১০-৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিকে বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এর বিরোধিতা করে ৬ জানুয়ারি ট্যারিফ কমিশনকে পৃথক চিঠি দেয় বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ৮ জানুয়ারি সব পক্ষকে নিয়ে ট্যারিফ কমিশন বৈঠক করলেও কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা শেষ হয়। পরে ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)। এ সুপারিশ নতুন করে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ বলেন, পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক বৈঠক হয়েছে। তাঁর দাবি, দেশীয় শিল্পের স্বার্থে যেসব সুতা শতভাগ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব, সেগুলোকে বন্ড সুবিধার বাইরে আনার বিষয়ে একমত হয়েছিল সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সুতা আমদানির অনিশ্চয়তায় বিদেশি ক্রেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এর ফলে তারা বাংলাদেশে নতুন অর্ডার দিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে পোশাক খাতের ব্র্যান্ড ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাঁর মতে, সমস্যা সমাধানে আগে জানতে হবে কেন স্পিনিং মিলগুলোর সুতা অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এমনিতেই পিছিয়ে আছে। গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় পণ্য পরিবহনে ১৫ থেকে ২০ দিন বেশি সময় লাগে। শ্রমিক উৎপাদনক্ষমতা, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম এবং উচ্চ সুদের হারও বড় চ্যালেঞ্জ। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও শিল্পটি টিকে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন করে নীতিগত অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন।
পাবলিকিয়ান টুডে/ এসএইচ | ফেসবুক
