উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি জোরদারের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানকে দুটি শর্ত পূরণ করতে হবে, নাহলে সামরিক হামলার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, ইরানকে কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি চালু রাখা যাবে না, এবং দ্বিতীয়ত, বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ বা জোরপূর্বক দমন কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার মেলানিয়ার ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্রের প্রিমিয়ারে ট্রাম্প বলেন, “আমাদের অনেক বড়যুক্তরাষ্ট্রও শক্তিশালী জাহাজ ইতিমধ্যেই ইরানের দিকে এগোচ্ছে। আমরা চাই পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সামলানো হোক। তবে প্রয়োজনে আমাদের নৌবহর দ্রুত ও শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে সক্ষম।” ট্রাম্পের এই মন্তব্যে স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক চাপ এবং সামরিক উপস্থিতি একসঙ্গে ব্যবহার করে ইরানের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে।
ইরানও সর্তক অবস্থানে রয়েছে। দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম। আরাগচি উল্লেখ করেছেন, বাহিনী ‘ট্রিগারে আঙুল রেখে’ প্রস্তুত অবস্থানে আছে। তিনি আরও বলেন, ইরান সবসময়ই পারস্পরিক লাভজনক ও ন্যায্য পারমাণবিক চুক্তি স্বাগত জানায়, যা হবে ভয়ভীতি ও হুমকিমুক্ত। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, কিছু বার্তা বিনিময় হলেও এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা নেই, যা ইঙ্গিত দেয় যে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেল সীমিত এবং উত্তেজনা অব্যাহত।
গত ডিসেম্বরে ইরানি মুদ্রার বড় পতনের পর শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তীব্র করেছে। বিক্ষোভের মুখে ইরানি কর্তৃপক্ষের কঠোর দমনপীড়ন আন্তর্জাতিক নজর আকর্ষণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হরানা জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে অন্তত ৬,৪৭৯ জন নিহত, যার মধ্যে ৬,০৯২ জন বিক্ষোভকারী, ১১৮ শিশু এবং ২১৪ জন সরকারি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। অন্যদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, নিহতের সংখ্যা ৩,১০০-এর বেশি, বেশিরভাগ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা দাঙ্গাকারীর হামলায় নিহত পথচারী। এই তথ্য ও দাবির ব্যবধান ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণের চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ডসকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ছয়টি প্রতিষ্ঠান ও ১৫ জন ব্যক্তির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একই সময়ে, তুরস্ক মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। ইস্তাম্বুলে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান জানিয়েছেন, আঙ্কারা ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বার্তা এবং নৌবহরের উপস্থিতি ইরানকে আলোচনায় বসানোর চেষ্টা, আবার ইরানও শক্ত অবস্থান বজায় রেখে চুক্তিতে স্বার্থান্বেষী রূপরেখা স্থাপন করতে চায়। সামরিক এবং কূটনৈতিক চাপের এই মিশ্রণ উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে, যেখানে তেলের সরবরাহ এবং নৌপথের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলো মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে, কারণ ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। সামগ্রিকভাবে, এই উত্তেজনা কেবল দুই দেশের মধ্যকার নয়, এটি পারমাণবিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি জটিল নেটওয়ার্কের প্রতিফলন।
পাবলিকিয়ান টুডে/ এ| মূলসূত্র: যুগান্তর







