পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে শনিবার জাতিগত বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চালানো সমন্বিত হামলায় অন্তত ১০ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও ৩৭ জন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়েছেন। পুলিশ, সামরিক স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক এবং বেসামরিক প্রশাসনিক কার্যালয়কে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নিরাপত্তা সূত্র জানায়, শনিবার সকালে প্রদেশজুড়ে ১২টিরও বেশি স্থানে একযোগে হামলা চালানো হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, “সন্ত্রাসীরা সমন্বিতভাবে একাধিক স্থানে আক্রমণ চালায়। পাল্টা অভিযানে ৩৭ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। আমাদের ১০ জন সদস্য শহীদ হয়েছেন এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।”
প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটায় দায়িত্বে থাকা এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সেখানে অন্তত চারজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে তারা মোট নিহত নিরাপত্তা সদস্যের সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি। ইসলামাবাদে অবস্থানরত এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এগুলো সমন্বিত হলেও “পরিকল্পনা দুর্বল ছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় হামলাগুলো ব্যর্থ হয়।” এদিকে, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা নুশকি জেলার ডেপুটি কমিশনারকে অপহরণ করেছে বলেও নিশ্চিত করেছেন কোয়েটায় দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা।
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ১২টি স্থানে চালানো “সমন্বিত হামলা প্রতিহত করার জন্য” নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমি এবং সমগ্র জাতি আমাদের শহীদদের নিয়ে গর্বিত।” একই সঙ্গে তিনি এই হামলার পেছনে ভারতের মদদ থাকার অভিযোগ করেন এবং বলেন, “দেশ থেকে সন্ত্রাসবাদ সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে।”
পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে চারটি জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা এএফপিকে জানিয়েছেন। আক্রান্ত এলাকায় মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা হয়েছে, যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং পুরো প্রদেশে ট্রেন চলাচল স্থগিত করা হয়েছে।
বেলুচিস্তানের সবচেয়ে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) হামলার দায় স্বীকার করেছে। এএফপিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা সামরিক স্থাপনা, পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে গুলি ও আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর চলাচল ব্যাহত করতে প্রধান মহাসড়কগুলো অবরোধ করা হয়।
কোয়েটায় এএফপির এক সাংবাদিক একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। শহরজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি করা হয়েছে; প্রধান সড়কগুলো ফাঁকা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল ওয়ালি (৩৮) বলেন, “সকাল থেকে একের পর এক বিস্ফোরণ হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি মায়ের জন্য রক্ত জোগাড় করতেই আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
উল্লেখ্য, এর একদিন আগেই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, বেলুচিস্তানে পৃথক দুটি অভিযানে ৪১ জন বিদ্রোহী নিহত হয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতায় জর্জরিত বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ, যদিও এখানকার মাটিতে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রদেশটি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় পিছিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ভিন প্রদেশ থেকে আসা শ্রমিক ও বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিকে লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে, যাদের তারা প্রদেশের সম্পদ লুটের অভিযোগে অভিযুক্ত করে।
পাকিস্তান সরকার বরাবরই প্রতিবেশী ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে। নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, অভিযানের সময় সন্ত্রাসীরা আফগানিস্তানে থাকা তাদের হ্যান্ডলারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিল।
গত বছর বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ৪৫০ যাত্রীবাহী একটি ট্রেনে হামলা চালিয়ে দুই দিনব্যাপী অবরোধ সৃষ্টি করেছিল, যাতে বহু মানুষ নিহত হয়।
পাবলিকিয়ান টুডে/ এ| মূলসূত্র: এএফপি







