বাংলাদেশ এমন একটি ভূ-টেকটনিক ক্রসরোডে অবস্থিত, যেখানে একসঙ্গে সক্রিয় রয়েছে তিনটি শক্তিশালী ভূতাত্ত্বিক কাঠামো—হিমালয়ান সংঘর্ষ অঞ্চল (Himalayan Collision Zone), শিলং মালভূমি অঞ্চল (Shillong Plateau Region) এবং আরাকান সাবডাকশন জোন (Arakan Subduction Zone)। এই তিনটি টেকটনিক ইঞ্জিনের সম্মিলিত প্রভাবে ভূমিকম্প বাংলাদেশে কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি প্লেট টেকটনিক প্রক্রিয়ার অবধারিত বাস্তবতা।
এই বাস্তবতার সাম্প্রতিক প্রমাণ মিলেছে একেবারে সাম্প্রতিক একটি ঘটনায়। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার অব সিসমোলজি (এনসিএস) জানায়, রোববার ১ ফেব্রুয়ারি ভোর ৪টা ০২ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে বাংলাদেশে ৩.০ মাত্রার একটি মৃদু ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। এনসিএসের তথ্যমতে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল অক্ষাংশ ২৪.৮৫ ডিগ্রি উত্তর ও দ্রাঘিমাংশ ৯২.০৭ ডিগ্রি পূর্বে যা বাংলাদেশের ভেতরেই অবস্থিত। ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ২০ কিলোমিটার গভীরে সংঘটিত এই কম্পনটি সিলেট শহর থেকে আনুমানিক ২১ কিলোমিটার দূরে ছিল। এতে কোথাও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, এমনকি অনেক এলাকায় কম্পনও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়নি। তবে ভূকম্পবিদদের মতে, এ ধরনের স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্পকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের উত্তর-পূর্বে শিলং মালভূমি একটি সক্রিয় ফল্ট সিস্টেম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যার ভয়াবহ প্রভাব অতীতে প্রত্যক্ষ করা গেছে। ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প যার মাত্রা ছিল প্রায় ৮.৭—এই শিলং মালভূমি ফল্ট সিস্টেম থেকেই উৎপন্ন হয়েছিল। সে সময় সিলেটসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিলং মালভূমি এখনো ভূ-টেকটনিকভাবে সক্রিয় এবং এখানে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এর পাশাপাশি রয়েছে হিমালয়ান সংঘর্ষ অঞ্চল, যেখানে ভারতীয় প্লেট প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার গতিতে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। এই সংঘর্ষই হিমালয়ের জন্ম দিয়েছে, তবে একই সঙ্গে এটি বিপুল পরিমাণ টেকটনিক স্ট্রেস জমা করে রাখছে। এই সঞ্চিত স্ট্রেসের একটি অংশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলাদেশে, স্থানান্তরিত হতে পারে—যা ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ভূতাত্ত্বিক কাঠামো হলো আরাকান সাবডাকশন জোন। বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত এই অঞ্চলে ভারতীয় প্লেট ধীরে ধীরে বার্মিজ মাইক্রোপ্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ভূকম্পবিদ্যার গবেষণায় এই সাবডাকশন জোনকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এই জোনের কিছু অংশ দীর্ঘদিন ধরে ‘লকড’ অবস্থায় রয়েছে—অর্থাৎ প্লেট দুটি আটকে আছে এবং জমে থাকা শক্তি মুক্ত হতে পারছে না। এই ধরনের লকড সেগমেন্ট হঠাৎ ভেঙে গেলে ৮ কিংবা ৯ মাত্রার মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্প সৃষ্টির বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়।
আরো পড়ুন- বাংলাদেশে আবার ভূমিকম্প: সাড়ে সাত ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীতে দ্বিতীয় ঝাঁকুনি
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে আরাকান আর্কের নিচে বর্তমানে যে পরিমাণ টেকটনিক শক্তি জমা রয়েছে, তা ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্পের সময়কার শক্তির সঙ্গে তুলনীয়। অর্থাৎ ইতিহাসের সেই ভয়াবহ ঘটনার পুনরাবৃত্তি অসম্ভব নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আশঙ্কা আরও গুরুতর, কারণ তখনকার তুলনায় আজকের বাংলাদেশ অনেক বেশি জনবহুল, নগরগুলো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং অধিকাংশ ভবন এখনো ভূমিকম্প সহনশীল নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি।
বিশেষ করে দেশের পূর্বাঞ্চল—চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার—গত এক দশকে ক্রমবর্ধমান সিসমিক অ্যাক্টিভিটি দেখাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এখানে একের পর এক ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, এগুলো সাবডাকশন প্লেটের গভীর অংশে স্ট্রেস ট্রান্সফারের ইঙ্গিত হতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে বড় ভূমিকম্পের আগে এমন ছোট কম্পনের একটি ক্লাস্টার তৈরি হয়, যা ভবিষ্যৎ বড় শক্তি নিঃসরণের পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই ঝুঁকির বাইরে নয় দেশের মধ্যাঞ্চলও। সাম্প্রতিক সময়ে নরসিংদী ও আশপাশের এলাকায় একটি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যা রাজধানী ঢাকা সহ পার্শ্ববর্তী একাধিক জেলায় স্পষ্ট কম্পন সৃষ্টি করে। যদিও এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে ভূবিজ্ঞানীদের মতে, এর অবস্থান ও কম্পনের বিস্তার বাংলাদেশের সিসমিক ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি। কারণ এই অঞ্চল সরাসরি কোনো প্রধান সাবডাকশন জোনের ওপর না থাকলেও এটি দেশের অভ্যন্তরীণ ফল্ট সিস্টেম এবং আঞ্চলিক স্ট্রেস ট্রান্সফারের প্রভাবাধীন। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ান সংঘর্ষ অঞ্চল ও শিলং মালভূমিতে সৃষ্ট টেকটনিক স্ট্রেস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মধ্যভাগে স্থানান্তরিত হতে পারে—নরসিংদীর ভূমিকম্প সেই প্রক্রিয়ারই একটি বহিঃপ্রকাশ।
নরসিংদী ও সিলেট অঞ্চলের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি স্পষ্ট সিসমিক প্যাটার্ন সামনে আসে। একদিকে দেশের উত্তর-পূর্বে শিলং মালভূমি ফল্ট সিস্টেম সক্রিয়, অন্যদিকে মধ্যাঞ্চলে অভ্যন্তরীণ ফল্ট ও স্ট্রেস রিডিস্ট্রিবিউশনের প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে। এর সঙ্গে পূর্বদিকে আরাকান সাবডাকশন জোনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শক্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সাম্প্রতিক ৩.০ মাত্রার ভূমিকম্প হয়তো একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। ভূগর্ভে যে টেকটনিক প্রক্রিয়া চলছে, তা থেমে নেই। বিজ্ঞানীরা আগাম তারিখ বা সময় বলতে না পারলেও এটুকু নিশ্চিতভাবে বলছেন উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বাস্তব এবং তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
পাবলিকিয়ান টুডে/ অর্ঘ্য




