ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশ করেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনগত ব্যবস্থায় যে ব্যাপক মামলা-জট তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মোট ৬৬৩টি মামলা দায়ের হয়েছে, এর মধ্যে ৪৫৩টি মামলা হচ্ছে হত্যা-সংক্রান্ত অভিযোগের একেবারে শীর্ষে। এই তথ্য এসেছে টিআইবি-এর গবেষণা প্রতিবেদন “কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি”-তে, যা ২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমণ্ডি অফিসে প্রকাশিত হয়।
টিআইবি জানায়, জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঘটে যাওয়া তাণ্ডব ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সারাদেশে মোট ১, ৭৮৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩৬টি হত্যা মামলা, আর সেই হত্যাকাণ্ডের জন্য ৬৬৩টি মামলায় শেখ হাসিনাকে আসামি হিসেবে নাম করা হয়েছে, এবং ৪৫৩টি হত্যা মামলায় সরাসরি তার নাম রয়েছে।
টিআইবি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব মামলার মধ্যে শুধু মাত্র ১০৬টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা পড়েছে, যার মধ্যে ৩১টি হত্যা মামলা। এই কম পরিমাণ অভিযোগপত্রের ফলে তদন্ত কার্যক্রমের ধীরগতি ও বিচার কার্যপ্রক্রিয়ার জটিলতা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
এছাড়া টিআইবি নারাজি ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কীভাবে কিছু মামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক নেতারা এবং পুলিশের সদস্যরা সঠিক তদন্ত বা প্রমাণ ছাড়াই মামলা দাখিল করেছেন, এমন অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অনেক সময় প্রাথমিক তদন্ত ছাড়া আদালতে মামলা স্বীকৃতি পাওয়া এবং প্রচার-চাপে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া বিচার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে, যা ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা তৈরি করছে।
টিআইবি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সারাদেশে প্রায় ১,৫০,০০০ মানুষকে আসামি করা হয়েছে এসব মামলায়, এবং তার মধ্যে ২১,৮৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে — যা একটি বিশাল পরিসরের আইনি চাপ ও সামাজিক প্রভাব তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীরা, সংসদ সদস্যরা ও উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা মামলার তালিকায় নাম রয়েছে। ইতোমধ্যে ১২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কিছু মামলায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
টিআইবি প্রতিবেদনে পুলিশকেও লক্ষ্য করা হয়েছে; পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ৭৬১টি মামলা দায়ের হয়ে ১,১৬৮ জন পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে, কিন্তু তাঁদের মধ্যে মাত্র ৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে — এই সংখ্যাগুলি বিচারপ্রক্রিয়া ও আইনের প্রয়োগে অন্তর্নিহিত জটিলতা ও অপর্যাপ্ত জবাবদিহির ইঙ্গিত দেয়।
অপরদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)-তে ৪৫০টি অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫টি মামলা গ্রহণযোগ্য হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এসব মামলায় ২০৯ জনকে আসামি করা হয়েছে, এবং ৮৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। বর্তমানে ১২টি মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন, যেখানে ১০৫ আসামি রয়েছে। টিআইবি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক আসামি দেশ থেকে পলাতক, এবং বহু অভিযোগ রয়েছে যে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা কেউ কেউ পলায়নের জন্য সহায়তা করেছেন।
টিআইবি প্রধান গবেষকরা তাদের প্রতিবেদনে বলেছিলেন, অনেক মামলার ভিত্তি দুর্বল, ঘটনা-নির্দিষ্ট প্রমাণ কম, এবং তদন্ত পদ্ধতি জটিল — এইগুলো বিচারপ্রক্রিয়াকে চরমভাবে চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে। ন্যায্য ও আইনগতভাবে বিচার কার্য সম্পাদন করতে না পারলে প্রকৃত অপরাধীও দোষমুক্ত থাকার সুযোগ পেতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থা।
টিআইবি-এর বিশ্লেষণে কেস ট্রেডিং, রাজনৈতিক হয়রানি, চাঁদাবাজি ও মামলায় নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার হুমকি-কে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাপের মুখে তদন্ত ছাড়াই মামলা গ্রহণ করেছে, যা বিচারের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ওপর গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।
এই গবেষণা প্রতিবেদনটি শুধু মাত্র মামলা-সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার জটিলতা, রাজনৈতিক সংঘর্ষের প্রভাব, এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা—এই তিনটি দিককে একসাথে তুলে ধরে। টিআইবি বলেছে, আদালতের রায় সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও, যদি পুরোপুরি due process মানা না হয়, তাহলে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বিচারের ন্যায্যতার ওপর সমালোচনা বাড়তে পারে।
পাবলিকিয়ান টুডে/ এবি| মূলসূত্র: প্রথম আলো







