চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে কৃত্রিম বাধার মুখে পড়েছে যৌথ বাহিনী। সন্ত্রাসীদের ধরতে সোমবার ভোরে শুরু হওয়া এই অভিযানে অংশ নেয় র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি। অভিযানের খবর আগাম পেয়ে সন্ত্রাসীরা আগের রাতেই এলাকায় একাধিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
অভিযানের শুরুতে দেখা যায়, বিভিন্ন সড়কে বড় ট্রাক রেখে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। কোথাও ভেঙে ফেলা হয়েছে কালভার্ট, আবার একটি স্থানে নালার স্ল্যাব তুলে ফেলা হয়েছে। ফলে যৌথ বাহিনীর যানবাহন ভেতরে প্রবেশে সাময়িকভাবে বাধার মুখে পড়ে। পরে ট্রাক সরিয়ে এবং ভাঙা কালভার্টের অংশ ইট–বালু দিয়ে ভরাট করে বাহিনীর সদস্যরা অগ্রসর হন।
চট্টগ্রাম নগরের প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকা জুড়ে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন–এর বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে অবস্থিত এই দুর্গম অঞ্চল প্রশাসনিকভাবে সীতাকুণ্ড উপজেলা–এর অন্তর্ভুক্ত হলেও নগরীর খুব কাছেই। পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকা। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়িতে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত চার দশকে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বসতি। এখনো পাহাড় কেটে প্লট-বাণিজ্য চলছে। এই দখল ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় গড়ে উঠেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী, যারা নিয়মিত পাহারা দিয়ে থাকে। অনেকের কাছে এই এলাকা দেশের ভেতর ‘আরেক রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে আইনকানুনের পরিবর্তে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নির্দেশই কার্যকর।
এলাকাটিতে সন্ত্রাসীদের দুটি প্রধান পক্ষ সক্রিয়। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্য পক্ষের নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন। আলীনগর এলাকায় ইয়াসিনের শক্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে জানা যায়। গত জানুয়ারিতে অভিযানে গিয়ে র্যাব সদস্য নিহত হওয়ার মামলার প্রধান আসামিও তিনি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ইয়াসিন অতীতে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুন–এর অনুসারী ছিলেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিজেকে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী–এর অনুসারী দাবি করেন। তবে র্যাব কর্মকর্তা হত্যার ঘটনার পর আসলাম চৌধুরী গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে জানান, জঙ্গল সলিমপুরে তার কোনো অনুসারী নেই এবং এ ঘটনায় বিএনপির কেউ জড়িত নন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান জানান, জঙ্গল সলিমপুরে ছিন্নমূল ও আলীনগর নামে দুটি গ্রাম রয়েছে। ছিন্নমূল পেরিয়ে আলীনগরে ঢোকার আগে একটি ট্রাক দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ট্রাক সরিয়ে এগিয়ে যান। পরে দেখা যায়, আগের রাতে একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেটি সাময়িকভাবে ভরাট করে বাহিনীর যানবাহন আলীনগরে প্রবেশ করে।
অভিযানের তথ্য আগে থেকেই সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এলাকায় সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন পর্যায়ে সোর্স রয়েছে—সিএনজি অটোরিকশা চালক থেকে শুরু করে স্থানীয় সহযোগীরা। কোনোভাবে তারা অভিযান সম্পর্কে আগাম খবর পেয়ে থাকতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, সোমবার সকাল ছয়টা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নিয়েছেন। অভিযানের অংশ হিসেবে সকাল থেকেই জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলা হয় এবং প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে তল্লাশি চৌকি বসানো হয়, যাতে কেউ পালিয়ে যেতে না পারে। বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে অভিযান পরিচালনা করছেন। নিরাপত্তার কারণে অভিযানের সময় সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, গত জানুয়ারিতে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া, যিনি র্যাব-৭–এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) ছিলেন। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানা–য় করা মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি ও শিল্পাঞ্চল) মো. রাসেল জানান, জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান এখনো চলমান রয়েছে। অভিযান শেষ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
পাবলিকিয়ান টুডে/ এ| মূলসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন







