খাবার টেবিলে পুরো পরিবার। ভাত গরম, তরকারির গন্ধ ভেসে আসছে রান্নাঘর থেকে। বাইরে হয়তো বৃষ্টি পড়ছে, সন্ধ্যার নরম আলো এসে পড়েছে জানালায়। কিন্তু কথা নেই। বাবার চোখ ফোনে, মা রিলস স্ক্রল করছেন, আর ছেলে ইউটিউব না চললে এক গ্রাসও মুখে তুলবে না। এই দৃশ্য আজ আর ব্যতিক্রম নয়। ঢাকার লক্ষ পরিবারের রোজকার ছবি এটাই। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা এই ছবিকেই ধরেছে সংখ্যা আর অভিজ্ঞতার ভাষায়।
এই বিভাগের চারজন শিক্ষার্থী ফারহানা মিথিলা, নুসরাত জাহান ইলমা, জুথি সাহা এবং সামিহা আলম ঢাকার বাবা-মায়েদের নিয়ে Focus Group Discussion এবং In-Depth Interview পরিচালনা করেছেন। সেখানে উঠে এসেছে এক অস্বস্তিকর সত্য: আমরা শারীরিকভাবে ঘরে আছি, কিন্তু মানসিকভাবে কোথাও না কোথাও হারিয়ে গেছি। সন্তান পাশে বসে আছে, আমরা তবু নেই।
অনুপস্থিতির নতুন সংজ্ঞা
আগে একজন বাবা যখন দেশের বাইরে থাকতেন, সন্তান তাঁকে মিস করত, সেটা স্বাভাবিক ছিল। দূরত্বের একটা কারণ ছিল, একটা ব্যাখ্যা ছিল। এখন বাবা পাশের ঘরে আছেন, কখনো বা একই সোফায় বসে আছেন, তবু সন্তান একা। এই নতুন ধরনের অনুপস্থিতির নাম গবেষকরা দিয়েছেন “mental absence” বা মানসিক অনুপস্থিতি। ফেসবুকের নোটিফিকেশন, ইউটিউবের অটোপ্লে, মেসেঞ্জারের অবিরাম নোটিফিকেশন এগুলো একজন অভিভাবককে তাঁর সন্তানের কাছ থেকে প্রতিদিন একটু একটু করে, খুব নীরবে দূরে নিয়ে যাচ্ছে।
Media Dependency Theory বলে, মানুষ যখন কোনো মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, সেই মাধ্যম তার আচরণ, সিদ্ধান্ত আর সম্পর্ককে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। ঢাকার বাবা-মায়েরাও এর ব্যতিক্রম নন। সারাদিনের যানজট, অফিসের চাপ, সংসারের টানাটানির পর সোশ্যাল মিডিয়া তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছে একমাত্র বিশ্রামের আশ্রয়। সেখানে কেউ কিছু চায় না, কেউ বকা দেয় না, শুধু স্ক্রল করতে থাকলেই চলে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের অন্য মানুষগুলো, বিশেষত শিশুরা, নীরবে পিছিয়ে পড়ছে।
সন্তান যা চাইছে, সে শুধু একজোড়া চোখ
গবেষণায় একজন মা বললেন: “আমার বাচ্চা কথা বলার বদলে ফোনের দিকে আঙুল দেখায়।” এই একটি বাক্যে অনেক কিছু লুকিয়ে আছে। শিশু শিখে নিচ্ছে যে মনোযোগ চাইলে ফোনের ভাষাতেই চাইতে হয়, মানুষের ভাষায় নয়। সরাসরি ডেকে লাভ নেই, কারণ বাবা-মা সেই ডাক শোনেন না। তাই সেও ফোনের দিকে হাত বাড়ায়।
আরেকজন বাবা জানালেন, তাঁর সন্তান খেতে বসলে ফোন না দিলে কান্নাকাটি করে। এটাকে আমরা বাচ্চার বায়না বলে উড়িয়ে দিতে পারি। কিন্তু একটু থামলে বুঝতে পারব, এই আচরণ আসলে সে শিখেছে আমাদের কাছ থেকেই। বাবা খেতে বসে ফোনে থাকেন, মা রান্না করতে করতে রিলস দেখেন। সন্তান তো সেটাই অনুসরণ করবে।
Attention Span Theory বলছে, অবিরাম ডিজিটাল উদ্দীপনা মানুষের মনোযোগকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। প্রতিটি নোটিফিকেশন, প্রতিটি নতুন পোস্ট মস্তিষ্ককে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। বাবা-মা যখন নিজেই একটানা মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না, সন্তানের মানসিক ও আবেগিক বিকাশে সেই ঘাটতির ছায়া দীর্ঘমেয়াদে পড়তে বাধ্য। গবেষণায় উঠে এসেছে শিশুদের মধ্যে emotional insecurity, attention deficit এবং ক্রমবর্ধমান device dependency-র স্পষ্ট প্রবণতা।
নিয়ম আছে, কিন্তু নিয়মের ভেতরে কেউ নেই
অনেক বাবা-মা সমস্যাটা বোঝেন। কেউ রাত দশটার পর সন্তানের ফোন নিয়ে রাখেন, কেউ বেশি ডেটা খরচ হলে Wi-Fi বন্ধ করে দেন। একজন অংশগ্রহণকারী বললেন: “নিয়ম নেই ঠিকই, তবে বেশি নেট চালালে বন্ধ করে দিই।” এটাই বাস্তবতা। নিয়মগুলো বেশিরভাগ সময় reactive, মানে আগে থেকে ভাবা নয়, পরিস্থিতি বেগতিক হলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত।
এই খাপছাড়া নিয়ন্ত্রণ সন্তানদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। আজ যা মানা, কাল তা নয়। আজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন চলছে, কাল হঠাৎ সব বন্ধ। এই অসামঞ্জস্যতা শুধু অনুশাসনের ব্যর্থতা নয়, এটা বিশ্বাসের ক্ষয়ও। সন্তান বুঝে নেয়, নিয়মটা আসলে নিয়ম নয়, মেজাজের উপর নির্ভরশীল।
কার্যকর parenting mediation মানে ভয় দেখানো বা কঠোর নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং সন্তানের সাথে কথা বলা, একসঙ্গে কনটেন্ট দেখা, বোঝানো কোনটা ভালো কোনটা নয়। কিন্তু যে বাবা-মা নিজেই স্ক্রিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাচ্ছেন, তিনি সেই কথোপকথন কোন মুখে শুরু করবেন?
এ যেন দ্বিমুখী তলোয়ার
সোশ্যাল মিডিয়া কিন্তু শুধু ক্ষতিই করছে না। গবেষণা এই দিকটাও সততার সাথে তুলে ধরেছে। একজন অংশগ্রহণকারী বললেন, “আমরা একসাথে Facebook-এ কনটেন্ট দেখি, বাচ্চারাও উপভোগ করে।” সোশ্যাল মিডিয়া পরিবারের দূরের সদস্যদের কাছে রাখে, প্যারেন্টিং টিপস দেয়, শিক্ষামূলক কনটেন্ট সহজলভ্য করে। সমস্যাটা প্ল্যাটফর্মে নয়, ব্যবহারের ধরনে।
যে বাবা সচেতনভাবে ফোন ব্যবহার করেন, সন্তানের সামনে সেটা নামিয়ে রাখতে পারেন, তাঁর সংসারের গল্প আলাদা। আর যিনি নোটিফিকেশনের টানে প্রতিটি মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তাঁর সন্তান বড় হচ্ছে একটা অদ্ভুত একাকীত্বে, যেখানে ঘর ভরা মানুষ কিন্তু সঙ্গ নেই।
শুধু পশ্চিমা সমস্যা নয়, এটা আমাদের
এই গবেষণার একটি বিশেষ গুরুত্ব হলো এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিচালিত। আন্তর্জাতিক গবেষণার বেশিরভাগই পশ্চিমা পরিবারকেন্দ্রিক, যেখানে পারিবারিক কাঠামো, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ আর প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশে পরিবার মানে শুধু nuclear unit নয়, একটি বিস্তৃত আবেগের জগৎ। সেখানে সম্পর্কের একটা ভিন্ন তাপ আছে, একটা ভিন্ন প্রত্যাশা আছে।
কিন্তু সেই উষ্ণতাকে ধরে রাখার ভাষাটা এখন সংকটে। ঢাকার ব্যস্ত মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা-মায়ের ক্লান্তি বাস্তব, আর সেই ক্লান্তির আশ্রয় হিসেবে স্মার্টফোনের প্রতি আসক্তিও বোধগম্য। কিন্তু আসক্তি আর বিশ্রাম এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যটাই এখন সবচেয়ে জরুরি বোঝার।
পথ কোথায়?
গবেষণা কেবল আঙুল তোলেনি, পথও দেখিয়েছে। ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো, পারিবারিক রুটিন তৈরি করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, authoritative parenting অর্থাৎ কর্তৃত্ব নয়, বোঝাপড়া ও সংলাপের উপর ভিত্তি করে সম্পর্ক গড়া। শুধু নিষেধ করলেই হবে না, কারণ ও প্রতিকার দুটোই সন্তানকে বোঝাতে হবে।
কিন্তু ব্যক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি কাঠামোগত উদ্যোগও দরকার। স্কুলে অভিভাবক সভায় শুধু পড়াশোনার কথা না বলে digital parenting নিয়েও আলোচনা হওয়া উচিত। হাসপাতালের শিশু বিভাগে স্ক্রিন টাইমের ক্ষতি নিয়ে পোস্টার থাকা উচিত। নীতিনির্ধারকদেরও এটিকে শুধু প্রযুক্তির সমস্যা না ভেবে পারিবারিক স্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে।
একটি শিশু যখন খাবার টেবিলে চুপ করে বসে থাকে, সে হয়তো কিছু বলছে না। কিন্তু সে দেখছে। দেখছে বাবার দৃষ্টি কোথায়, মা কার দিকে তাকিয়ে আছেন। এই নীরব পর্যবেক্ষণ থেকেই সে শিখছে মানুষের সাথে কীভাবে থাকতে হয়, বা আসলে থাকতে হয় না। প্রতিটি স্ক্রিন-মুক্ত সন্ধ্যা, প্রতিটি সম্পূর্ণ মনোযোগে শোনা কথা, প্রতিটি ফোন নামিয়ে রেখে করা আলিঙ্গন একটি বিনিয়োগ। সন্তানের ভবিষ্যতে, সম্পর্কের গভীরতায়, পরিবারের উষ্ণতায়।ফোনটা নামিয়ে রাখা ছোট একটি কাজ। কিন্তু সন্তানের চোখে সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বার্তা।
পাবলিকিয়ান টুডে/ অর্ঘ্য| মূলসূত্র: বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস- এর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ফারহানা মিথিলা, নুসরাত জাহান ইলমা, জুথি সাহা এবং সামিহা আলম পরিচালিত “Parental Social Media Use, Parenting and Family Communication” শীর্ষক গবেষণা







