আল শাহারিয়া, জাবিপ্রবি প্রতিনিধি
জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবিপ্রবি) মব তৈরি করে রেজিস্ট্রার ও অর্থ পরিচালককে অবরুদ্ধ রেখে শারীরিক লাঞ্ছনা এবং জোরপূর্বক পদত্যাগপত্র আদায়ে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে একদল আওয়ামীপন্থী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে এ ঘটনা ঘটে।
সরেজমিনে ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে অভিযুক্ত শিক্ষকরা প্রশাসনিক ভবনে রেজিস্ট্রারের কক্ষে প্রবেশ করে ভেতর থেকে তালা আটকে দেন। প্রায় তিন ঘণ্টার বেশি সময় তাকে সেখানে অবরুদ্ধ রাখা হয়। একপর্যায়ে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর আদায়ে সফল হলে রেজিস্ট্রারকে জোরপূর্বক কক্ষ থেকে বের করে প্রশাসনিক ভবন থেকে পুরোপুরি বের করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিচতলায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় সংবাদ সংগ্রহের কাজে ক্যাম্পাসের সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত হয়ে ঘটনার কারণ জানতে চাইলে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অভিযুক্তরা পিছু হটেন। এসময় তার হাতের আঙ্গুলে ক্ষত দেখা যায়। একই দিন অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালককেও তার কক্ষে গিয়ে অপমান-অপদস্থ করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করার ঘটনা ঘটে।
অবরুদ্ধ হওয়ার বিষয়ে জাবিপ্রবির রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ নূর হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আমাকে অবরুদ্ধ করে জোরপূর্বক সাক্ষর নিয়ে পদত্যাগপত্র আদায় করেছে। তারা আমার গায়ে হাত তুলেছে এবং শারীরিকভাবে হেনস্তা করেছে। আমি তাদের বলেছি— আমি পদত্যাগ করব না, আমার অপরাধ থাকলে কর্তৃপক্ষ আমাকে বিধি মোতাবেক অব্যাহতি দিক। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে জোর করে সই (সাক্ষর) নেয়।’ তিনি দাবি করেন, নিয়মবহির্ভূত পূর্বের চাকরি গণনার (সার্ভিস কাউন্ট) মতো অবৈধ সুবিধা না দেওয়ার ক্ষোভ থেকেই তারা সংঘবদ্ধ হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আসলাম বলেন, ‘তারা (শিক্ষক-কর্মচারী) দলবল নিয়ে আমার কক্ষে এসে আমাকে অকথ্য ভাষায় অপমান-অপদস্থ করেন। এখনই রিজাইন দিতে হবে বলে তারা অত্যন্ত মারমুখী আচরণ করেন। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, মান-সম্মানের ভয়ে আমি তাদের আগে থেকে লিখে আনা পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য হয়েছি।’
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত এই শিক্ষক ও কর্মচারীদের অধিকাংশই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং তারা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, এই অভিযুক্ত আওয়ামীপন্থী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাই এখন নবনিযুক্ত উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ হতে মরিয়া। উপাচার্যের যোগদানের পর থেকেই বিতর্কিত এই শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তার আশেপাশে দেখা যাচ্ছে। এমনকি উপাচার্য একাডেমিক পরিদর্শন করতে গেলেও আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মচারীদের দেখা গিয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগে এই ঘটনায় সরাসরি যাদের নাম উঠে এসেছে এবং তাদের অতীত ও সাম্প্রতিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিচে তুলে ধরা হলো:
ড. সৈয়দ নাজমুল হুদা (সহকারী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান) ও ড. মাহমুদুল আলম শুভ (সহকারী অধ্যাপক, সিএসই): বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত ‘রোড টু স্মার্ট বাংলাদেশ’ কর্মসূচিতে দেশব্যাপী নৌকার পক্ষে তৃণমূল পর্যায়ে ভোট প্রার্থনার ক্যাম্পেইনার ও প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন এই দুই শিক্ষক।
ড. এ. এইচ. এম মাহবুবুর রহমান (সহকারী অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ): বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই শিক্ষক বিগত সরকারের আমলে ‘মুজিব শতবর্ষের ইতিহাস’ গ্রন্থ রচনাসহ বিভিন্নভাবে আওয়ামী লীগের হয়ে সক্রিয় ছিলেন। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখে ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং সরকারের দমন-পীড়নের পক্ষে বৈধতা উৎপাদনের চেষ্টা করেন।
হোসাইন মাহমুদ (প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ): জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর দমনপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া অডিওতে তাকে জুলাই অভ্যুত্থানে অভিযুক্তদের বিচার নিয়ে “রিভার্স বিচার”-এর হুমকি দিতে শোনা যায়। ঢাবিতে থাকাকালেও তার বিরুদ্ধে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
ড. মো. আল মামুন সরকার (সহকারী অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ): একাধিক গুরুতর অভিযোগে বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত থাকা এই শিক্ষক বিগত সরকারের আমলে ‘উন্নয়নের রোল মডেল শেখ হাসিনা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন ও টিভি টকশোতে শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে নিয়ে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
মালিহা আক্তার মালা (কম্পিউটার অপারেটর): মেলান্দহ উপজেলা যুব মহিলা লীগের সভাপতির দায়িত্বে থাকা এই কর্মচারী স্থানীয় একটি নাশকতা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছিল।
ইমরুল কবির (প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ): সহকর্মীদের দেওয়া ফাঁস হওয়া তার একটি হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে দেখা যায় , যেখানে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ’ লালনের কথা উল্লেখ করে সহকর্মীদের তাদের ‘অবস্থান কর্মসূচিতে’ না আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং এই কর্মসূচির সাথে নিজেদের “এক ও অভিন্ন” বলে দাবি করেছেন।
এছাড়া সিএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ হাসান, সিএসই বিভাগের প্রভাষক মো. সাইদুর রহমান এবং অর্থ ও হিসাব বিভাগের সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. খাইরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন এই ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্ত বলে দাবি করেন রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ নূর হোসেন চৌধুরী।
রেজিস্ট্রারকে হেনস্তার এই ঘটনার পেছনে বিগত সরকারের আমলে সুবিধাভোগীদের ক্ষোভের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে জাবিপ্রবি শাখা ছাত্রলীগের (বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী) আহ্বায়ক কাওসার আহমেদ স্বাধীনের একটি মন্তব্যে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও সামাজিক মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শনের দায়ে বহিষ্কৃত এই নেতা রেজিস্ট্রার মহোদয়ের বক্তব্যের ভিডিওতে মন্তব্য করে হামলার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। মন্তব্যে তিনি রেজিস্ট্রারকে ইঙ্গিত করে বলেন, “আজকে আপনি অপদস্ত, কুকুরের ন্যায় লাথি খাচ্ছেন… এখানেই শেষ নয়, এটা কেবলমাত্র শুরু”।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিজেদের পূর্বের এই অনিয়ম ও অভিযোগগুলো ধামাচাপা দিতেই অভিযুক্তরা দলবদ্ধ হয়ে মব তৈরি করেছেন। মূলত নতুন উপাচার্যের কাছে নিজেদের প্রভাব প্রমাণ করা এবং তার ঘনিষ্ঠ হওয়ার মরিয়া চেষ্টা থেকেই ক্যাম্পাসে পরিকল্পিতভাবে এমন অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্তদের একজন ড. সৈয়দ নাজমুল হুদা গায়ে হাত তোলা ও জোরপূর্বক পদত্যাগপত্র নেওয়ার সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা প্রমোশন ও ভুক্তভোগী শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকারের বিষয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম। রেজিস্ট্রার মহোদয় নিজের অদক্ষতা ও কাজের চাপ সামলাতে না পেরে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং সজ্ঞানে পদত্যাগের আবেদন জমা দিয়েছেন।’
সিএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাহমুদুল আলম (শুভ) অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘রেজিস্ট্রার সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। আমি সেখানে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের বিষয়ে কথা বলেছিলাম। আর অর্থ পরিচালকের সাথে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে, অসুস্থতাজনিত কারণে হয়তো ভুলবশত তিনি আমার নাম বলেছেন।’ অন্যদিকে, সিএসই বিভাগের প্রভাষক মো. সাইদুর রহমান দাবি করেন, তিনি কেবল দাপ্তরিক কাজের অগ্রগতি জানতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সিএসই বিভাগের আরেক শিক্ষক মুহাম্মদ হাসান দাবি করেন, পূর্বের একটি বিল সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে রেজিস্ট্রারের সাথে তার বাদানুবাদ হয়েছিল এবং সেই আক্রোশ থেকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রেজিস্ট্রার তার নাম জড়িয়েছেন।
সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক ইমরুল কবির জানান, ঘটনার দিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তিনি পরীক্ষার হলে চিফ ইনভিজিলেটরের দায়িত্বে ছিলেন, তাই সেখানে তার উপস্থিত থাকার প্রশ্নই আসে না। বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. এ. এইচ. এম মাহবুবুর রহমান এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, এই ঘটনার আরেক অভিযুক্ত শিক্ষক ড. মো. আল মামুন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অর্থ ও হিসাব বিভাগের মো. খাইরুল ইসলাম পরে কথা বলবেন বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। প্রভাষক হোসাইন মাহমুদ (আপেল) ও কম্পিউটার অপারেটর মালিহা আক্তার মালার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
সার্বিক বিষয়ে জাবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আমির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘এমন ঘটনা ঘটে থাকলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব শৃঙ্খলাবিধি আছে। কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে যথাযথ নিয়মে উপাচার্য বা রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিতভাবে জানাতে হবে। লিখিত অভিযোগ ছাড়া মব সৃষ্টি করে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা হেনস্তা করার কোনো সুযোগ নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার; এটি নিয়মের মধ্য দিয়েই চলবে। এ ধরনের ঘটনার সাথে জড়িতদের বিষয়ে বিধি মোতাবেক খতিয়ে দেখা হবে। উপাচার্য একা কোনো সিদ্ধান্ত নেন না, বিষয়টি সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করে পর্যালোচনা শেষে প্রশাসন যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।’
পাবলিকিয়ান টুডে/ এসএইচ | ফেসবুক







