বর্তমান বৈশ্বিক সংঘাতের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। অতীতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নীলনকশা আজও মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ায় অস্থিরতার আগুন জ্বালিয়ে রাখছে। তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের সে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে কৃত্রিম বিভাজন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৭ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের (বর্তমান তুরস্ক) পতন ঘটে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কাছে পরাজিত হয়ে অটোমানরা মিশর, লেবানন, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, হেজাজসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ হারায়। একই ভাষা, ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর অধিবাসীরা তখন এক শাসনের অধীনে থাকলেও ব্রিটিশ ও ফরাসি কূটনীতিক মার্ক সাইকস ও জর্জ পিকো নামে পরিচিত দুজন কৌশলী নিপুণ হাতে মধ্যপ্রাচ্যকে বহুভাগে বিভক্ত করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মুসলিমরা যেন অটোমান নেতৃত্বে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে। ১৯১৭-এর পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স শিয়া ও সুন্নিদের আলাদা ভুখণ্ড না দিয়ে লেবানন, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, ওমান ও জর্ডানের মতো দেশে শিয়া-সুন্নির মিশ্রণ ঘটিয়ে ‘স্বাধীনতা’ দেয়। এর ফলশ্রুতিতে প্রায় সব মধ্যপ্রাচ্যের দেশেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে শিয়া-সুন্নির রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব।
বেলফোর থেকে ইসরাইল: ফিলিস্তিনের বেদনার শুরু
জার্মানির বিভক্তির দায় ইহুদিদের উপর চাপিয়ে ‘মাইন ক্যাম্ফ’-এ হিটলার সেই বিদ্বেষ উস্কে দেন। ১৯৩৩ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি ইহুদি নির্যাতন শুরু করলে তারা স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখে। ব্রিটেন সেই স্বপ্নকে পাথেয় করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিদের কাছ থেকে সাহায্য নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বেলফোর ফিলিস্তিনের বুকে ইহুদিদের জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন—ইতিহাসের ‘বেলফোর ঘোষণা’। তখন থেকেই ইহুদিরা ব্রিটেন-ফ্রান্সের পৃষ্ঠপোষকতায় ফিলিস্তিনে জমি কিনতে শুরু করে। অথচ ইউরোপ-আমেরিকায় লক্ষ লক্ষ মাইল খালি থাকার পরেও ব্রিটেন ইহুদিদের ফিলিস্তিনে পুনর্বাসনের সুদূরপ্রসারী কৌশল নিয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে তিন ভাগে বিভক্ত করে: ৫৬ শতাংশে ইসরাইল, ৪৩ শতাংশে ফিলিস্তিন, আর জেরুজালেম আন্তর্জাতিক শহর। আরব লীগ তা প্রত্যাখ্যান করলেও ১৯৪৮ সালে ইসরাইল স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এরপর পাঁচটি বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে ইসরাইল সিনাই, গোলান মালভূমি ও পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীরের বিশাল অংশ দখল করে নেয়।
কাশ্মীর: ব্রিটিশ বিভক্তির অমোঘ ক্ষত
দেশভাগের পর ব্রিটিশ রাজ দেশীয় রাজ্যগুলোকে ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার কিংবা স্বাধীন থাকার ‘অধিকার’ দেয়। ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে ভারত-পাকিস্তানের প্রথম যুদ্ধ শুরু হয়, যখন পাকিস্তান আশঙ্কা করে কাশ্মীরের হিন্দু মহারাজা হরি সিং ভারতের সঙ্গে যোগ দেবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অথচ হিন্দু শাসিত এই রাজ্যে পাকিস্তানি সেনা ও উপজাতি বাহিনী আক্রমণ চালালে মহারাজা ভারতের সাহায্য নিতে বাধ্য হন এবং ভারতের সঙ্গে যুক্ত হন। যুদ্ধ চলতে থাকে। ‘নিয়ন্ত্রণ রেখা’ বরাবর ভারত পায় কাশ্মীরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (উপত্যকা, জম্মু, লাদাখ), আর পাকিস্তান এক-তৃতীয়াংশ (আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তান) দখল করে। ১৯৬৫, ১৯৯৯ ও বর্তমান ২০২৫ সালেও কাশ্মীর নিয়ে উত্তেজনা চরমে উঠেছে এবং দুপক্ষে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। ব্রিটিশ কুশীলবের এই অমোঘ ক্ষত আজও রক্তাক্ত।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটলেও তাদের টানাপড়েনে আঁকা কৃত্রিম সীমানা, ধর্মীয় মিশ্রণ ও ভৌগোলিক কৌশল আজও বিশ্ব যুদ্ধের বীজ বয়ে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে কাশ্মীর প্রত্যেক সংঘাতের গোড়ায় লেখা আছে ঔপনিবেশিক নীলনকশা।
লেখক: সাজিদ বিন রশীদ, শিক্ষার্থী, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর
পাবলিকিয়ান টুডে/ এ|







